Wednesday, 14 March 2018

চতুর্থ মাত্রায় ভ্রমণ - পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং

জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং আজ বুধবার মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর ও আপেক্ষিকতা নিয়ে গবেষণার জন্য বিখ্যাত ছিলেন ব্রিটিশ এই পদার্থবিদ।

স্টিফেন হকিং

বাংলায় ভাষান্তর করা তাঁর একটি লেখা মাসিক বিজ্ঞানচিন্তার ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়।
লেখাটি পাঠকদের জন্য দেওয়া হলো:

বিজ্ঞানে একসময় সময় ভ্রমণ নিয়ে চিন্তার চর্চা ছিল না। আমিও এ নিয়ে কথাবার্তা বলতাম না খুব একটা। পাছে না আবার পাগলের খেতাব পাই। কিন্তু এখন আর সে ভয় নেই। এখন একটা টাইম মেশিন পেলে আমি দেখে আসব সেই মুহূর্তটি, যখন গ্যালিলিও আকাশের দিকে তাক করেছিলেন তাঁর টেলিস্কোপখানা। কিংবা চলে যাব মহাবিশ্বের শেষ প্রান্তেও। দেখে আসব, কীভাবে ইতি ঘটবে এ মহাবিশ্বের।
সময় ভ্রমণ কী করে সম্ভব সেটা বুঝতে হলে পদার্থবিদের মতো করে চিন্তা করতে হবে। হ্যাঁ, বলছি চতুর্থ মাত্রার কথা। বিষয়টাকে একটু কঠিন মনে হলেও আসলে তা নয়। একটি ছোট বাচ্চাও জানে, প্রতিটি বস্তুই ত্রিমাত্রিক স্থানে অবস্থান করে। এই যে আমিও। সবকিছুরই আছে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা। দৈর্ঘ্য আছে আরেক ধরনেরও। একজন মানুষ হয়তো ৮০ বছর বাঁচতে পারেন। আবার স্টোনহেঞ্জের পাথরগুলো দাঁড়িয়ে আছে হাজার হাজার বছর ধরে। আমাদের সৌরজগত্ থাকবে আরও কয়েক শ কোটি বছর। ফলে সবকিছুর দৈর্ঘ্য স্থানের দিকে যেমন আছে, তেমনি আছে সময়ের দিকেও। তাই সময় ভ্রমণের মানে হলো, এই চতুর্থ মাত্রা দিয়ে চলাচল।
ধরুন, আপনি একটি রাস্তা ধরে সোজাসুজি চলছেন। এটা হলো একমাত্রিক চলাচল। ডানে বা বাঁয়ে ঘুরলে সঙ্গে আরেকটি মাত্রা যোগ হবে। পথটা পাহাড়ি হলে একটু ওপরে উঠলে বা নিচে নামলেই যোগ হবে আরও একটি মাত্রা। কিন্তু সময়-মাত্রাটি ব্যবহার করে কীভাবে সামনে-পেছনে আসা যায়? চলচ্চিত্রে অনেক সময় টাইম মেশিন দেখানো হয়, যেটায় চেপে বসলেই সময়-সুড়ঙ্গ পার হয়ে চলে যাওয়া যায় অতীত বা ভবিষ্যতে। বুদ্ধিটা একেবারে খারাপ না। সময়-সুড়ঙ্গের কথাও ভাবছেন বিজ্ঞানীরাও। নাম ওয়ার্মহোল। আমাদের আশপাশেই রয়েছে বহু ওয়ার্মহোল। কিন্তু অনেক অনেক ক্ষুদ্র। এত ক্ষুদ্র যে খালি চোখে দেখার প্রশ্নই ওঠে না।
জগতের কোনো কিছুই একদম মসৃণ নয়। সবচেয়ে মসৃণ বস্তুতেও কিছু ভাঁজ বা কুঞ্চন থাকেই। একই কথা খাটে সময়ের জন্যও। অণু ও পরমাণুর চেয়েও ক্ষুদ্র মাপকাঠিতে কোয়ান্টাম ফোম নামে একটি জায়গা আছে। ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব এখানেই। এই কোয়ান্টাম জগতে স্থানকালের মধ্য দিয়ে অবিরত তৈরি ও ধ্বংস হয় সুড়ঙ্গ। এরা যুক্ত করে দুটি আলাদা স্থান ও সময়কে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই সুড়ঙ্গ ১ সেন্টিমিটারের ১ লক্ষ কোটি কোটি কোটি কোটি ভাগের এক ভাগ পরিমাণ চওড়া। তাহলে পার হওয়ার উপায়? কিছু কিছু বিজ্ঞানীর বিশ্বাস, কোনোভাবে একটি ওয়ার্মহোলকে পাকড়াও করে হয়তো মানুষের পারাপারের মতো বড় করে তোলা যাবে। হয়তো তার এক মুখ থাকবে পৃথিবীতে, আরেক মুখ বহু বহু দূরের কোনো গ্রহে বা দূরের কোনো অতীত বা ভবিষ্যতে।
কিন্তু সময় ভ্রমণের একটি সমস্যা হলো কিছু প্যারাডক্স বা স্ববিরোধিতা। এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাতটির নাম গ্র্যান্ডফাদার প্যারাডক্স। এটাকে একটু সরল করে অন্যভাবে বলি। নাম দিলাম ম্যাড সায়েন্টিস্ট প্যারাডক্স। মনে করুন আমি একটি সময়-সুড়ঙ্গ বানালাম, যা মাত্র এক মিনিট লম্বা। এটায় চোখ রেখে পাগল বিজ্ঞানী নিজের এক মিনিট আগের চেহারা দেখছেন। কিন্তু তিনি যদি সুড়ঙ্গের ওপারের চেহারায় গুলি করেন তাহলে কী হবে? তিনি তাহলে এক মিনিট আগে মারা গেলেন? তাহলে গুলিটা কে করল?
এ ধরনের টাইম মেশিন মহাবিশ্বের মৌলিক একটি নীতির বিরুদ্ধে যায়। ফলাফলের আগে কারণ ঘটে। কখনোই উল্টোটা নয়। তা না হলে মহাবিশ্ব হতো বিশৃঙ্খল। ফলে আমার বিশ্বাস, কোনো না কোনোভাবে বিজ্ঞানী নিজেকে গুলি করতে ব্যর্থ হবেনই। তা ছাড়া ওয়ার্মহোল বেশিক্ষণ টিকেও থাকতে পারবে বলে মনে হয় না। ধরুন, একটি স্পিকার দিয়ে গান বাজছে। তার দিয়ে মাইক যুক্ত করে শব্দ বাড়ানো হলো। মাইকের সামনেই যদি স্পিকার রাখা হয় তাহলে কী হবে? প্রতিবার ঘুরে এসে শব্দ ক্রমশ বাড়তে থাকবে। কেউ না থামিয়ে দিলে একসময় পুরো সাউন্ড সিস্টেম ভেঙে পড়বে। একই ঘটনা ঘটবে ওয়ার্মহোলের ক্ষেত্রেও। তবে এখানে শব্দের বদলে কাজ করবে বিকিরণ। ওয়ার্মহোলের মুখ খুলতে না-খুলতেই এতে বিকিরণ প্রবেশ করবে এবং লুপ আকারে ঘুরবে। একসময় এর শক্তি এত বাড়বে যে এটি ধ্বংস হয়ে যাবে। অর্থাত্ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সময়-সুড়ঙ্গগুলো দিয়ে বাস্তবে কাজ হবে না।

তবে সময় ভ্রমণ করে ভবিষ্যতে যাওয়ার আরেকটি উপায় আছে। সময় প্রবাহিত হয় নদীর মতো। অবিরত। তবে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে প্রবাহের গতি আলাদা। ১০০ বছর আগে কথাটা প্রথম বলেছিলেন আইনস্টাইন। কথাটার প্রমাণ আছে আমাদের হাতের নাগালেই। আমরা বর্তমানে হরদম জিপিএস ব্যবহার করি। এটি কাজ করে উপগ্রহের মাধ্যমে। উপগ্রহে আছে খুব নিখুঁত ঘড়ি। কিন্তু শতভাগ নয়। পৃথিবীর ঘড়ির তুলনায় উপগ্রহের ঘড়ি প্রতিদিন এক সেকেন্ডের এক শ কোটি ভাগের এক ভাগ দ্রুত চলে। এটাকে হিসাবে না ধরলে জিপিএসের নির্দেশনা হবে ভুল। ওই ঘড়িগুলো দ্রুত চলে কারণ পৃথিবীর তুলনায় মহাশূন্যে সময়ই দ্রুত চলে। এর কারণ পৃথিবীর ভর। একটি বস্তু যত ভারী হয়, সেটি তত বেশি ধীর করে দেয় সময়কে। এর ফলেই উন্মুক্ত হয়েছে সময় ভ্রমণের আরেকটি সম্ভাবনা।
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে রয়েছে গ্যালাক্সির সবচেয়ে ভারী বস্তুগুলো। রয়েছে একটি সুপারম্যাসিভ বা অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর (ব্ল্যাকহোল)। ভর চল্লিশ লক্ষ সূর্যের সমান, যে ভর কেন্দ্রীভূত আছে একটি মাত্র বিন্দুতে। এর খুব কাছ থেকে আলোও বের হতে পারে না। সময়কে সবচেয়ে বেশি বিকৃত করে কৃষ্ণগহ্বর। তৈরি করে প্রাকৃতিক টাইম মেশিন।
মনে করুন, কেউ মহাকাশযানে চেপে কৃষ্ণগহ্বর ভ্রমণে গেলেন। পৃথিবী থেকে দেখা যাচ্ছে, প্রতি ১৬ মিনিটে একবার তিনি প্রদক্ষিণ করছেন কৃষ্ণগহ্বরটিকে। কিন্তু নভোচারী প্রতি ১৬ মিনিটের বদলে অনুভব করছেন মাত্র ৮ মিনিট। ফলে কৃষ্ণগহ্বর থেকে দূরে অবস্থান করা কারও চেয়ে তিনি অনুভব করবেন অর্ধেকটা সময়। যানের নভোচারী সময় ভেদ করে চলতে থাকবেন। ধরুন, তিনি পাঁচ বছর এভাবে ঘুরলেন। ফিরে এসে দেখবেন, পৃথিবীতে পার হয়ে গেছে ১০ বছর। মানে, পাঁচ বছর বেশি।
তার মানে অতিভারী কৃষ্ণগহ্বররা এক একটি টাইম মেশিন। এটি ওয়ার্মহোলের মতো প্যারাডক্সেরও জন্ম দেয় না। তবে ভাবনাটি পুরাপুরি বাস্তবসম্মত নয়। এবং খুব ভয়ংকর। তার ওপর এভাবে খুব বেশি দূর ভবিষ্যতে যাওয়াও যাবে না। তবে খুশির খবর হলো, উপায় আছে আরেকটিও। এর জন্য চলতে হবে অনেক অনেক বেশি বেগে। আমরা জানি, মহাবিশ্বে গতির একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত আছে। এটি হলো সেকেন্ডে ১৮৬০০০ মাইল, যার অপর নাম আলোর বেগ। কোনো কিছুর বেগ এর চেয়ে বেশি হতে পারে না। বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, এই বেগের কাছাকাছি বেগে চলতে পারলে আপনি চলে যাবেন ভবিষ্যতে। মনে করুন, পৃথিবীকে বেষ্টন করে গোল করে একটি রেলপথ তৈরি করা আছে। এর ওপর দিয়ে একটি দ্রুতগামী ট্রেন চলতে শুরু করল। বেগ আলোর বেগের খুব কাছাকাছি। ট্রেনটি একের পর এক চক্কর খেতে থাকবে পৃথিবীকে ঘিরে। প্রায় সাতবার প্রতি সেকেন্ডে। এবার ট্রেনের ভেতরে অদ্ভুত কাণ্ড ঘটতে শুরু করবে। বাইরের জগতের তুলনায় সময় প্রবাহিত হবে ধীরে। যেমনটা ঘটেছিল কৃষ্ণগহ্বরের কাছে। তবে ট্রেনের বেগ বাড়িয়ে আলোর বেগের ওপরে নেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কেউ একজন ট্রেনের ভেতরে দৌড়ানো শুরু করলে মিলিত বেগ কি কোনোভাবেই আলোর বেগের চেয়ে বেশি হওয়া সম্ভব নয়? না। কারণ প্রকৃতির সূত্রমতে, সময় এমনভাবে ধীর হয়ে যাবে যে বেগ আলোর বেগের নিচেই থাকবে।
ধরুন, ২০৫০ সালের ১ জানুয়ারি তারিখে ট্রেনটি ছেড়ে গেল। ১০০ বছর পরে, ২১৫০ সালের একই তারিখে শেষ হলো যাত্রা। কিন্তু ভেতরের যাত্রীদের সময় অতিবাহিত হবে মাত্র এক সপ্তাহ। তাদের সময় এতটাই ধীরে চলেছিল যে এক সপ্তাহেই বাইরের জগতে ১০০ বছর অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। তার মানে, তারা চলে এসেছেন ভবিষ্যতের পৃথিবীতে। হ্যাঁ, এমন ট্রেন বানানো প্রায় অসম্ভব। তবে ইউরোপীয় গবেষণা সংস্থা সার্নে (ঈঊজঘ) কিন্তু এ ধরনের জিনিস আছে।
এখানে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কণা ত্বরকযন্ত্র। অবস্থান সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরের মাটির গভীরে। রয়েছে ১৬ মাইল লম্বা একটি বৃত্তাকার সুড়ঙ্গ। ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা ছুটে চলে এই সুড়ঙ্গ ধরে। সেকেন্ডের ভগ্নাংশ সময়ের মধ্যে এদের বেগ শূন্য থেকে ঘণ্টায় ৬০ হাজার মাইলে উঠে যায়। আরও শক্তি দিলে এ বেগ এত বাড়ে যে কণিকাগুলো প্রতি সেকেন্ডে সুড়ঙ্গকে ১১ হাজার বার চক্কর খায়, যা আলোর বেগের খুব কাছাকাছি। এভাবে এরা আলোর ৯৯.৯৯ ভাগ পর্যন্ত বেগ অর্জন করতে পারে। এ সময় এরা শুধু স্থান ভেদ করেই চলে না। চলে সময় ভেদ করেও। আমরা সেটা কীভাবে জানলাম? পাই-মেসন নামে একধরনের কণা আছে। এমনিতে এরা এক সেকেন্ডের আড়াই হাজার কোটি সেকেন্ডের এক ভাগ সময়ের মধ্যে ভেঙে যায়। কিন্তু বেগ আলোর কাছাকাছি হলে এরা ভাঙতে সময় নেয় ৩০ গুণ বেশি সময়।
এ তো গেল কণিকাদের সময় ভ্রমণ। আমরা মানুষেরা তা কীভাবে করব? আমার মনে হয়, মহাকাশে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। সবচেয়ে দ্রুতগামী মনুষ্যবাহী যানের নাম অ্যাপোলো ১০। বেগ ছিল ঘণ্টায় ২৫ হাজার মাইল। কিন্তু সময় ভ্রমণের জন্য আরও ২ হাজার গুণেরও বেশি জোরে ছুটতে হবে। আলোর বেগের কাছাকাছি যেতে এর সময় লাগবে ছয় বছর। এক সপ্তাহের ভেতর এটি সৌরজগতের বহিস্থ গ্রহগুলো পার হয়ে যাবে। দুই বছরের মাথায় সৌরজগত্ পার। আরও দুই বছর পরে বেগ হবে আলোর ৯০ ভাগ। পৃথিবী থেকে ৩০ লক্ষ কোটি দূরে। সময় ভ্রমণও শুরু হয়ে যাবে এই সময়। পৃথিবীর দুই ঘণ্টায় যানে এক ঘণ্টা। যেমনটা হয়েছিল কৃষ্ণগহ্বরগামী যানের ক্ষেত্রে। আলোর ৯৯ ভাগ বেগ অর্জন করতে আর ২ বছর দরকার। এ অবস্থায় যানের এক দিনে পৃথিবীতে এক বছর হয়ে যাবে। এবার সত্যিই ভবিষ্যতে চলে যাওয়া গেল।
সময়ের ধীরগতির আরেকটি ভালো দিক আছে। আমরা অনেক বড় বড় পথ পেরোতে পারব জীবদ্দশাতেই। যেমন আমাদের ছায়াপথের অপর প্রান্তে যেতে ৮০ বছর লাগবে। কতই না বিস্ময়কর এই জগত্। যেখানে সময় ভিন্ন স্থানে ভিন্ন বেগে চলে। আমাদের চারপাশে লুকিয়ে থাকে ওয়ার্মহোল নামক সময়-সুড়ঙ্গ। পদার্থবিদ্যার জ্ঞান একদিন হয়তো সত্যিই আমাদের চতুর্থ মাত্রায় ভ্রমণ করাতে সক্ষম হবে।
ভাষান্তর: আব্দুল্যাহ আদিল মাহমুদ

লেখক

জ্ঞান অন্নেষী

Saturday, 28 October 2017

আমাদের মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি কী?

মহা বিশ্বের কিছু রহস্য নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে বা ভবিষ্যৎ নিয়ে। আর  বিজ্ঞানী হিসেবে যে কয়েকজন ব্যক্তি সারা বিশ্বে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে তাদের মধ্যে অন্যতম একজন জামাল নজরুল ইসলাম। ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটিতে তার লেখা বই পাঠ্য হিসেবে পড়ানো হয়। বিশ্বের বেশ কয়েকটি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার লেখা বই “The Ultimate Fate of the Universe”কিন্তু আক্ষেপের ব্যাপার হলো বাংলাদেশী এই বিজ্ঞানীর বিশ্ববিখ্যাত এই বইটি স্বয়ং বাংলাতে অনূদিত হয়নি এখনো। মহাবিশ্বের অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি বিষয় নিয়ে লেখা বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর অত্যন্ত চমৎকার এই বইটি বাংলায় ফিরিয়ে আনা উচিৎ ছিল অনেক আগেই। এই দায়িত্ববোধ থেকেই বইটিকে অনুবাদের প্রয়াস নেয়া হয়েছে। এখানে ১ম অধ্যায়ের বাংলা রূপান্তর উপস্থাপন করা হলো। অনুবাদ করেছেনঃসিরাজাম মুনির শ্রাবণ





বাংলার গর্ব বিজ্ঞানী জামাল নজরুল ইসলাম (১৯৩৯ – ২০১৩)। ছবি: wikipedia
অন্তিম পরিণতিতে এই মহাবিশ্বের ভাগ্যে কী ঘটবে?
বুদ্ধিমত্তা বিকাশের পর থেকেই এই প্রশ্নটি আন্দোলিত করেছে এক মানুষ থেকে আরেক মানুষের মন। এই প্রশ্ন থেকে মানুষের মনে জন্ম নিয়েছে আরো কিছু প্রশ্ন। এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ কী? কিংবা এই মানবজাতির ভবিষ্যৎ কী? বর্তমানে প্রশ্নগুলো খুব সহজ মনে হলেও অনেক কাল পর্যন্ত এদের কোনো বিজ্ঞানসম্মত ও গ্রহণযোগ্য উত্তর ছিল না। এ ধরনের প্রশ্নের গ্রহণযোগ্য ও বিজ্ঞানসম্মত উত্তর প্রদানের জন্য জ্যোতির্বিদ্যা ও সৃষ্টিতত্ত্বে যে পরিমাণ উন্নতি অর্জন হওয়া দরকার তা অর্জিত হয়েছে মাত্র কয়েক দশক আগে।
মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি বা অন্তিম পরিণতি ঘটতে অবশ্যই অনেক অনেক সময় লাগবে। ব্যাপক সময়ের ব্যবধানে এই মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ কী হবে তা নির্ভর করে দুটি বিষয়ের উপর- (১) মহাবিশ্বের বর্তমান গঠন কেমন এবং (২) মহাবিশ্ব কীভাবে এই গঠনে এসেছে। এ দুটি প্রশ্নের উত্তর জানলে মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ কী সে সম্পর্কে জানা যাবে। মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভালোভাবে আলোচনা করতে গেলে আস্ত একটা বই রচনা করার প্রয়োজন হবে। এখানে পাঠকদেরকে সংক্ষেপে একটি সামগ্রিক ধারণা (Bird’s eye view) দেবার চেষ্টা করা হবে।
সামগ্রিকভাবে মহাবিশ্বকে বিবেচনা করলে বলা যায় মহাবিশ্বের মূল গাঠনিক উপাদান হচ্ছে গ্যালাক্সি। মহাবিশ্বের সীমাহীন শূন্যতার ‘সাগরে’ কোটি কোটি ‘দ্বীপ’সদৃশ নক্ষত্রের সমন্বয়ে এক একটি গ্যালাক্সি গঠিত। সাধারণ একটি গ্যালাক্সিতে প্রায় একশো বিলিয়ন (১০^১১)-এর মতো নক্ষত্র থাকে। আমাদের সূর্য এরকমই একটি নক্ষত্র।
সাধারণ একটি গ্যালাক্সিতেই প্রায় একশো বিলিয়ন নক্ষত্র থাকে। ছবি: পিন্টারেস্ট
পৃথিবী, সূর্য ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহ নিয়ে আমরা যে গ্যালাক্সিতে বসবাস করি তাকে বলা হয় মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি বা আকাশ গঙ্গা ছায়াপথ। এটিকে শুধুমাত্র ‘গ্যালাক্সি’ বা ‘ছায়াপথ’ নামেও ডাকা হয়। পর্যবেক্ষণযোগ্য সকল গ্যালাক্সি এবং গ্যালাক্সির সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য বস্তুর সমন্বয়ে এই মহাবিশ্ব গঠিত। জোরালো প্রমাণ আছে যে, গড়পড়তাভাবে মহাবিশ্বের সকল অংশেই এসব বস্তু ও গ্যালাক্সি সমানভাবে ছড়িয়ে আছে।
ফরনাক্স নক্ষত্রমণ্ডলীতে গ্যালাক্সির একটি সমৃদ্ধ ক্লাস্টার। কয়েকটি গ্যালাক্সি যদি পারস্পরিক মহাকর্ষীয় আকর্ষণে আবদ্ধ থাকে তাহলে ঐ গ্যালাক্সিগুলোকে একসাথে বলা হয় ‘ক্লাস্টার’। ফরনাক্স ক্লাস্টারের গ্যালাক্সিগুলোও পারস্পরিক মহাকর্ষীয় আকর্ষণে বাধা। ১০^২৭ বছর পর এরকম অতিবিশাল ক্লাস্টার সংকুচিত হয়ে একটি সাধারণ ব্ল্যাকহোলে পরিণত হবে। অতিবিশাল এই ক্লাস্টারের আকার হবে এখানে থাকা সবচেয়ে ছোট গ্যালাক্সির চেয়েও ছোট। ছবি: এস্ট্রোনমি নাউ
পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এটা প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত হয়েছে যে, গ্যালাক্সিগুলো একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাই বলা যায় মহাবিশ্ব স্থির অবস্থায় নেই, গতিশীল বা চলমান অবস্থায় আছে। গ্যালাক্সিগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এর মানে হলো মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে। গ্যালাক্সিগুলো যেহেতু একটি নির্দিষ্ট হারে একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, তাই সেখান থেকে অনুমান করা হয় অনেক অনেক আগের কোনো এক সময়ে এসব গ্যালাক্সি নিশ্চয়ই একত্রিত অবস্থায় ছিল। ধারণা করা হয় সময়টা ১৩.৮ বিলিয়ন বছর আগে।
মনে করা হয় ঐ সময়ে কল্পনাতীত বিশাল এক বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়। ঐ বিস্ফোরণে একত্রে পুঞ্জিভূত থাকা মহাবিশ্বের সকল পদার্থ প্রচণ্ড বেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তীতে এসব পদার্থ আলাদা আলাদাভাবে ঘনীভূত হয়। গ্যালাক্সি হিসেবে বর্তমানে আমরা যাদেরকে দেখতে পাই তারা সকলেই আসলে সেসব ঘনীভূত পদার্থের ফল। আলাদা আলাদা অঞ্চলে ঘনীভূত হয়ে জন্ম নিয়েছে আলাদা আলাদা গ্যালাক্সি। যে বিস্ফোরণের ফলে গ্যালাক্সিগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে এবং পরস্পর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে সেই বিস্ফোরণটিকে বলা হয় ‘বিগ ব্যাং’।
সৃষ্টির শুরুতে এই মহাবিশ্বের সকল পদার্থ একত্রে পুঞ্জীভূত ছিল। ছবি: সেন্টার ফর থিওরিটিক্যাল কসমোলজি – ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ/সম্পাদনা: লেখক
বিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্নের মাঝে একটি হচ্ছে- মহাবিশ্বের এই প্রসারণ কি চিরকাল চলতেই থাকবে? নাকি ভবিষ্যতে কোনো এক সময় প্রসারণ বন্ধ হয়ে সংকোচন শুরু হবে? এর স্পষ্ট কোনো উত্তর এখনো জানা নেই। মহাবিশ্ব যদি চিরকাল প্রসারিত হতেই থাকে, তাহলে এ ধরনের মহাবিশ্বকে বলে ‘উন্মুক্ত মহাবিশ্ব’। যদি প্রসারণ বন্ধ হয়ে যায় এবং সংকোচন শুরু হয় তাহলে এ ধরনের মহাবিশ্বকে বলে ‘বদ্ধ মহাবিশ্ব’।
আমাদের এই মহাবিশ্ব কি বদ্ধ নাকি উন্মুক্ত? এই মহা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি জ্যোতির্বিজ্ঞানীদেরকে তাড়িরে বেড়ায় সবসময়। মহাবিশ্বের অন্তিম পরিণতি- মহাবিশ্বের চূড়ান্ত নিয়তি নির্ভর করে এ প্রশ্নের উত্তরের উপর। বেশ কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক সাক্ষ্য-প্রমাণ বলে মহাবিশ্ব উন্মুক্ত। তবে এটি পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।
ধরে নিলাম মহাবিশ্ব উন্মুক্ত। যদি উন্মুক্ত হয়, তাহলে এর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে? গ্যালাক্সিগুলো যেহেতু মহাবিশ্বের মূল উপাদান, তাই প্রশ্নটিকে আমরা গ্যালাক্সির সাপেক্ষেও করতে পারি। এভাবে মহাবিশ্ব যদি উন্মুক্ত হয়, তাহলে অতি দীর্ঘ সময় পরে গ্যালাক্সিগুলোর কী পরিণতি হবে? একটি সাধারণ (Typical) গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করি। এ ধরনের একটি গ্যালাক্সি মূলত অনেকগুলো নক্ষত্রের সমন্বয়ে গঠিত। প্রত্যেক নক্ষত্রই সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়। সময় শেষ হলে আয়ু ফুরিয়ে গেলে সেসব নক্ষত্র মারাও যায়। এটাকে বলা যায় ‘নক্ষত্রের চূড়ান্ত পর্যায়’। এই পর্যায়ে পৌঁছার পর নক্ষত্রের মাঝে তেমন কোনো পরিবর্তন সাধিত হয় না, যা হয় তা খুবই সামান্য। এই সামান্যটুকু হতেও অতি বিশাল সময়ের প্রয়োজন হয়। কমপক্ষে দশ বিলিয়ন বছর লাগে।
তিন উপায়ে নক্ষত্রের মৃত্যু হতে পারে। শ্বেত বামন, নিউট্রন নক্ষত্র ও ব্ল্যাকহোল। এই তিন পর্যায়ে নক্ষত্রের উপাদানগুলো অত্যন্ত ঘনীভূত অবস্থায় থাকে। এদের মাঝে যে নক্ষত্রে উপাদানগুলো সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত অবস্থায় থাকে সেগুলোকে বলা হয় ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণ বিবর।
নক্ষত্রের তিন ধরনের মৃত্যুর পর্যায়। ছবি: গেমার ডট কম/সম্পাদনা: লেখক
যদি যথেষ্ট সময় দেয়া হয়, তাহলে একসময় না একসময় একটি গ্যালাক্সির সকল নক্ষত্রই মারা যাবে। সেসব নক্ষত্রের কোনো কোনোটি শ্বেত বামন হবে, কোনো কোনোটি নিউট্রন নক্ষত্র হবে আর কোনো কোনোটি হবে ব্ল্যাকহোল। কোনো নক্ষত্র যদি শ্বেত বামন, নিউট্রন ও ব্ল্যাকহোল এই তিন অবস্থার কোনোটিতে উপনীত হয়, তাহলে আমরা সেই নক্ষত্রকে বলতে পারি মৃত নক্ষত্র। কোনো গ্যালাক্সির সবগুলো নক্ষত্র মরে যেতে একশো বিলিয়ন থেকে এক হাজার বিলিয়ন বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে। মোটামুটিভাবে এক হাজার বিলিয়ন বছরের ভেতর একটি গ্যালাক্সি মৃত নক্ষত্র দিয়ে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। নক্ষত্রের উত্তাপের অনুপস্থিতিতে পুরো গ্যালাক্সিজুড়ে বিরাজ করবে শীতলতা আর শীতলতা। গ্রহ, উপগ্রহ ও অন্যান্য ক্ষুদ্র বস্তুর মাঝে তখনো পারস্পরিক আকর্ষণ বিদ্যমান থাকবে। উন্মুক্ত মহাবিশ্বে গ্যালাক্সিগুলো তখনো একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে যেতে থাকবে। ফলে গ্যালাক্সিগুলোর মাঝে পারস্পরিক দূরত্বও বেড়ে যাবে অনেক।
এই অবস্থায় পৌঁছানোর পর গ্যালাক্সিগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে আরো অতি-বিশাল সময় পার হয়ে যাবে। মৃত নক্ষত্রগুলো অন্যান্য নক্ষত্রের সাথে সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে গ্যালাক্সি থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসবে। এই প্রক্রিয়ায় গ্যালাক্সির প্রায় ৯৯% মৃত নক্ষত্র নিক্ষিপ্ত হয়ে বের হয়ে যাবে। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে বিলিয়ন বিলিয়ন (১০^১৮) বছর বা বিলিয়ন বিলিয়ন বিলিয়ন (১০^২৭) বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে।
অবশিষ্ট ১% মৃত নক্ষত্র মিলে অতি-ঘন ও অতি-সংকুচিত একটি অবস্থা সৃষ্টি করবে। এরা পরস্পর একত্র হয়ে একটি অতি ভারী ব্ল্যাকহোল সৃষ্টি করবে, যার ভর হবে সূর্যের ভরের চেয়ে বিলিয়ন গুণ বেশি। এই ব্ল্যাকহোলকে আমরা বলতে পারি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল বা দানবীয় কৃষ্ণবিবর।
অবশিষ্ট নক্ষত্রগুলো একত্র হয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল তৈরি করবে। ছবি: বিয়ন্ড আর্থি স্কাইস
এখানে গ্যালাক্সির যে ক্রমপরিবর্তনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেটাকে বলা হয় ‘গ্যালাক্সির পরিবর্তন গতিবিদ্যা’ বা Dynamical evolution of galaxy।
নক্ষত্রের তিন ধরনের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছি। আরো উল্লেখ করেছি মৃত পর্যায়ে চলে গেলে নক্ষত্রের মাঝে সামান্যতম কোনো পরিবর্তন ঘটতেও দশ বিলিয়ন বা তার চেয়েও বেশি সময় লাগে। আসলে সময়ের ব্যবধান যখন কয়েক বিলিয়ন বছর হয়, তখন চূড়ান্ত অবস্থার মাঝেও কম-বেশি পরিবর্তন সম্পন্ন হয়। ব্ল্যাকহোল সাধারণত সবকিছু নিজের মধ্যে টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে ভারী হয়। কিন্তু বিলিয়ন বিলিয়ন বছর সময়ের ব্যবধানে বিবেচনা করলে দেখা যাবে মৃত ব্ল্যাকহোলও বিকিরণ করতে করতে ধীরে ধীরে ভর হারাতে থাকে। এই ধীর প্রক্রিয়ায় বিকিরণের মাধ্যমে আস্ত ব্ল্যাকহোলও নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে। হোক সেটা অসীমতুল্য সময়, কিন্তু তারপরেও এটি এটি নিঃশেষ হবে। সূর্যের ভরের সমান কোনো ব্ল্যাকহোল এই প্রক্রিয়ায় ১০^৬৫ বছরের ভেতর নিঃশেষ হয়ে যাবে। (সূর্যের সমান ভরের নক্ষত্র সাধারণত ব্ল্যাকহোল হয় না। হিসেবের সুবিধার জন্য একক হিসেবে মাঝে মাঝে সূর্যের ভর ব্যবহার করা হয়।)
এই সময়টা অত্যন্ত বেশি। আস্ত একটি গ্যালাক্সি অত্যন্ত ধীর গতিতে মরে ভূত হয়ে একটি মাত্র ব্ল্যাকহোলে পরিণত হতে অত্যন্ত বিশাল সময় লাগে। কিন্তু সূর্যের ভরের সমান ছোট একটি ব্ল্যাকহোল বিকিরণের মাধ্যমে নিঃশেষ হতে তার চেয়েও অনেক গুণ বেশি সময় লাগবে। ব্ল্যাকহোলের বিকিরণের মাত্রা একদমই কম। স্বল্প মাত্রার কারণেই নিঃশেষ হতে এত বেশি সময় লাগে।
গ্যালাক্সির কেন্দ্রে এক বা একাধিক ব্ল্যাকহোল থাকে। এ ধরনের কেন্দ্রীয় ব্ল্যাকহোল অতি-বৃহৎ ও অত্যন্ত ভারী হয়। কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারে এ ধরনের কেন্দ্রীয় ব্ল্যাকহোলের বেলায় কী ঘটবে? এটি কি চিরকাল অস্তিত্ববান থাকবে, নাকি এটিও পরিবর্তনের চক্রে ক্ষয়ে গিয়ে তার রাজসুলভ জৌলুশ হারাবে? হ্যাঁ, এরও ক্ষয় হবে। এ ধরনের কেন্দ্রীয় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল ১০^৯০ বছরের ভেতর ক্ষয়ে নিঃশেষ হয়ে যাবে। এর চেয়েও বৃহৎ ও ভারী ব্ল্যাকহোল আছে। সেগুলোকে বলা হয় সুপার গ্যালাকটিক ব্ল্যাকহোল। কোনো ক্লাস্টারে থাকা কয়েকটি গ্যালাক্সি একত্রিত হয়ে এ ধরনের ব্ল্যাকহোল তৈরি করে।[1] এ ধরনের অতি বৃহৎ ও অতি ভারী ব্ল্যাকহোলও ১০^১০০ বছরে বিকিরণের মাধ্যমে ক্ষয়ে নিঃশেষিত ও বাষ্পীভূত অবস্থায় পরিণত হয়ে যাবে।
বিকিরণের মাধ্যমে সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলও নিঃশেষ হয়ে যায়। ছবি: মিডিয়াম
এই প্রক্রিয়াতে ১০^১০০ বছরের মাঝে গ্যালাক্সিগুলোর সকল ব্ল্যাকহোল বিকিরণের মাধ্যমে ক্ষয়ে ক্ষয়ে সম্পূর্ণরূপে উবে যাবে। এরপর মহাবিশ্বে থাকবে শুধু শান্তশিষ্ট নিউট্রন নক্ষত্র ও শ্বেতবামন নক্ষত্র। আর থাকবে মহাজাগতিক মাপকাঠিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু বস্তু। এই বস্তুগুলো গ্যালাক্সির ঘটনাবহুল সংঘর্ষের মুহূর্তে সেখান থেকে ছিটকে বেরিয়ে গিয়েছিল। এই বস্তুগুলো আর মৃত নক্ষত্রগুলো তখন চির অন্ধকারময় মহাবিশ্বে অনন্তকালব্যাপী একা একা দিন পার করবে।
এই অবশিষ্ট বস্তুগুলোর মধ্যেও সূক্ষ্ম কিছু পরিবর্তন ঘটবে। তবে তা খুব ধীরগতির। সময়ও লাগবে খুব বেশি। ১০^১০০ বছরে যেখানে পুরো মহাবিশ্ব স্তিমিত হয়ে যাবে, সেখানে এসব অবশিষ্ট বস্তুর মাঝে সামান্য পরিবর্তন আসতে তারচেয়েও বেশি সময়ত লাগবে। তাহলে অবশিষ্ট বস্তুগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি কী হবে?
এখানে এসে আমরা আরেকটা সংকটে পড়ে যাই। এই প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিতভাবে এখনো জানা নেই। কিছু আনুমানিক ধারণা আছে। একটি সম্ভাবনা হচ্ছে শ্বেতবামন ও নিউট্রন নক্ষত্রগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে কৃষ্ণবিবরে পতিত হবে এবং পরবর্তীতে বিকিরণের মাধ্যমে তারাও নিঃশেষ হয়ে যাবে। কোয়ান্টাম বলবিদ্যার কিছু নিয়ম-নীতি এমনটাই বলে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগবে (১০^১০)^৭৬ বছর। এই সংখ্যাটি কল্পনাতীত পরিমাণ বিশাল। ‘বিলিয়ন’ শব্দটিকে এক বিলিয়ন বার লিখলে সেটি যত বড় সংখ্যা হবে তা-ও (১০^১০)^৭৬ এর তুলনায় একদম নস্যি।
মহাবিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করার সময় মানবজাতি, মানব সভ্যতা ও প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা চলে আসে। উন্মুক্ত মহাবিশ্বে অতি বৃহৎ সময়ের প্রেক্ষাপটে মানুষের ভবিষ্যৎ কী? সুদূর ভবিষ্যতে প্রাণ ও সভ্যতা কীভাবে নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখবে? টিকে থাকার জন্য জীবন্ত প্রাণেরা কোন প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেবে তা বলা মোটামুটি অসম্ভব। তবে প্রাণ ও সভ্যতার টিকে থাকা নির্ভর করে শক্তির উৎসের উপর। যেমন পৃথিবীর ক্ষেত্রে শক্তির উৎস হচ্ছে সূর্য। পৃথিবীর সমস্ত প্রাণ ও সভ্যতা পুরোপুরি নির্ভর করে আছে সূর্যের উপর।সূর্য না থাকলে কোনো প্রাণও টিকে থাকতে পারতো না, কোনো সভ্যতারও জন্ম হতো না।
প্রাণ ও সভ্যতা টিকে থাকে নক্ষত্রের শক্তির আশীর্বাদে। ছবি: নাসা
আগামী ১০^১০০ বছর বা তার চেয়েও বেশি সময় পর্যন্ত যথেষ্ট পরিমাণ শক্তির উৎস বিদ্যমান থাকবে। তত্ত্ব অন্তত পক্ষে সে কথাই বলে। সভ্যতা যদি ঐ সময় পর্যন্ত টিকে থাকে, তাহলে এরপর থেকেই সভ্যতাকে শক্তি সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। সীমাবদ্ধ কিছু শক্তি নিয়ে অনিশ্চিত দিন পার করতে হবে। এই সময়ের পরে কী ঘটবে কিংবা এই সমস্যা কাটিয়ে উঠার উপায় কী তা এখনো অমীমাংসিত রহস্য। তবে এই ব্যাপারে কিছু অনুমান ও সম্ভাবনা আছে। পরবর্তীতে এসব সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
মহাবিশ্ব সম্বন্ধে উপরে যে ধারণা প্রদান করা হয়েছে সেগুলো উন্মুক্ত মহাবিশ্ব মডেলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। উন্মুক্ত না হয়ে এই মহাবিশ্ব যদি বদ্ধ হয় তাহলে কী হবে? মহাবিশ্ব যদি বদ্ধ হয়, তাহলে এর প্রসারণ একটি নির্দিষ্ট সীমায় গিয়ে থেমে যাবে। বর্তমানে গ্যালাক্সিগুলোর মধ্যে গড় যে দূরত্ব বিদ্যমান, তা ধীরে ধীরে দ্বিগুণ পর্যন্ত হবে। এই অবস্থায় এটি ৪০ বা ৫০ বিলিয়ন বছর পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। এরপরই প্রসারণের উল্টো প্রক্রিয়ায় সংকুচিত হওয়া শুরু করবে। একটি সিনেমাকে যদি ব্যাকওয়ার্ডের মাধ্যমে উল্টো করে টেনে শেষ থেকে শুরুতে আনা হয়, তাহলে যেরকম হবে, মহাবিশ্বের সংকোচনের ঘটনাও সেরকমই হবে। ৯০ থেকে ১১০ বিলিয়ন বছর পরে মহাবিশ্বের ঘনত্ব অত্যন্ত বেড়ে যাবে। পাশাপাশি প্রচণ্ড উত্তপ্তও হয়ে যাবে। এর পরপরই Big Crunch বা বৃহৎ সংকোচন সংঘটিত হবে। অগ্নিবৎ উত্তাপে মহাবিশ্বের সকল বস্তু একত্রে মিলে যাবে। তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ফাঁকা থাকবে না, সব দিক থেকে পূর্ণ হয়ে যাবে। এ যেন অনেকটা গ্রহ নক্ষত্র গ্যালাক্সির ‘সংঘবদ্ধ সংকোচন’। এই পরিস্থিতিতে কোনো প্রকার প্রাণ টিকে থাকার সম্ভাবনা একদমই ক্ষীণ। বিগ ক্রাঞ্চের পরে কী ঘটবে কিংবা সেখানে ‘পরে’ বলতে আদৌ কোনোকিছুর অস্তিত্ব থাকবে কিনা তা কেউ জানে না।
বিগ ক্রাঞ্চের সময় মহাবিশ্বের সকল বস্তু একত্র হয়ে যাবে। ছবি: হাউ স্টাফ ওয়ার্কস
উন্মুক্ত মহাবিশ্ব সম্পর্কে সংক্ষেপে অনেক কিছু উল্লেখ করা হয়েছে এখানে। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের করা গবেষণায় এমন কিছু বেরিয়ে এসেছে যা একটু গোলমেলে। একে সঠিক হিসেবে ধরে নিলে উন্মুক্ত মহাবিশ্ব সম্পর্কে এখানে যে ধারণা প্রদান করা হয়েছে তাতে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। পদার্থের অন্যতম গাঠনিক উপাদান প্রোটন। এরা পরমাণুর মধ্যে একত্রিত অবস্থায় থাকে। পদার্থবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন অতি দীর্ঘ সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রোটন স্থায়ী নয়, ভারসাম্যহীন। পদার্থবিজ্ঞানীদের এই অনুমান সত্য হলে এটা মেনে নিতে হবে যে একসময় না একসময় প্রোটনগুলো পরস্পর থেকে বিশ্লিষ্ট হয়ে যাবে। সকল প্রোটন যদি আলাদা হয়ে যায় তাহলে তা মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতিতে প্রভাব রাখবে।
প্রোটনগুলো একত্রে না থেকে আলাদা হবার মানে হচ্ছে অণু-পরমাণুর রূপ পাল্টে যাওয়া। তেজস্ক্রিয় ভারী মৌলে প্রোটনগুলো দুই দলে ভাগ হয়ে যায় বলেই এ ধরনের পরমাণু ভেঙে গিয়ে স্বতন্ত্র দুটি পরমাণু তৈরি কহয়। আর অণু-পরমাণু দিয়েই পুরো মহাবিশ্ব গঠিত। প্রোটন তথা অণু-পরমাণুতে পরিবর্তন সম্পন্ন হওয়া মানে মহাবিশ্বের পরিবর্তন হওয়া। অণু-পরমাণুর সম্মিলিত ক্ষুদ্র পরিবর্তন পুরো মহাবিশ্বের আচার-আচরণে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসবে।
পদার্থবিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন বৃহৎ সময়ের প্রেক্ষাপটে প্রোটন ভারসাম্যহীন আচরণ করে। ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক
এখন প্রশ্ন হতে পারে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি নিয়ে এত মাথা ঘামানোর প্রয়োজন কী? এই প্রশ্নের উত্তর অন্য একটি প্রশ্নের উত্তরের মতো। বিপদ ও মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মানুষ কেন এভারেস্টে আরোহন করে? কারণ সেখানে চ্যালেঞ্জ আছে, সমস্যা আছে। যেখানে সমস্যা আছে, সেখানেই মানুষ সমাধান খুঁজে নিতে চেষ্টা করে। মানব মনের প্রকৃতিই হচ্ছে অবিরতভাবে অনুসন্ধান করে যাওয়া এবং জ্ঞানের নতুন সীমানা তৈরি করা। মহাবিশ্ব ও মানব সভ্যতার চূড়ান্ত পরিণতি- এটা বেশ আগ্রহোদ্দীপক সমস্যা। এই চূড়ান্ত পরিণতির সাথে পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও জ্ঞানের অন্যান্য শাখার মৌলিক কিছু প্রশ্ন জড়িত। মহাবিশ্বের চূড়ান্ত পরিণতি কেমন হবে তার উপর ভিত্তি করে এসব মৌলিক বিষয়ের উত্তর নির্ধারিত হবে। মহাবিশ্বের শেষ পরিণতি সম্বন্ধে ধারণা পরিষ্কার হবার মাধ্যমে জ্ঞানের এসব শাখার প্রভূত উন্নতি হতে পারে।
[টীকা ১] বিগ ব্যাংয়ের ফলে গ্যালাক্সিগুলো একে অপর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, কিন্তু কিছু কিছু গ্যালাক্সি আছে যারা নিকটবর্তী কয়েকটি গ্যালাক্সির সাথে মহাকর্ষীয় আকর্ষণে বাধা থাকে। আকর্ষণে বাধা সবগুলো গ্যালাক্সিকে একত্রে বলা হয় স্তবক বা ক্লাস্টার। পারস্পরিক আকর্ষণে তারা সকলে একসময় একত্র হয়ে যাবে তখন সেখানে সুপারগ্যালাকটিক ব্ল্যাকহোল তৈরি হবে।
বি: দ্র: বইয়ের মূল টেক্সট এবং এখানে প্রকাশিত টেক্সটের মাঝে সামান্য পার্থক্য আছে। ওয়েবসাইটের জন্য অপ্রয়োজনীয় বলে দেয়া হয়নি এখানে। বইটি যখন সম্পূর্ণভাবে কাগজে ছাপা হয়ে প্রকাশিত হবে, তখন টেক্সট মূল বইয়ের মতোই থাকবে। বিজ্ঞানের বিষয়গুলো পাঠকের বোঝার সুবিধার জন্য এখানের কোনো কোনো অংশে অনুবাদক কর্তৃক ক্ষুদ্র ব্যাখ্যা সংযোজিত হয়েছে। এখানে ব্যবহৃত কোনো ছবিই মূল বইতে ছিল না, পাঠকের অনুধাবনের সুবিধার জন্য অনুবাদক কর্তৃক সংযোজিত হয়েছে। তবে কোনোভাবেই মূল লেখকের বক্তব্যের ভাব ক্ষুন্ন করা হয়নি। প্রকাশিত বইতে অনুবাদকের সংযোজিত ব্যাখ্যা আলাদা করে নির্দেশিত থাকবে।
কৃতজ্ঞতা ঃSirajam Munir Shraban (roar media)

সূত্র ঃ roar media, ইন্টারনেট ।

লেখকঃ জ্ঞান অন্বেষী 

Friday, 22 September 2017

স্বপ্ন সম্পর্কিত কিছু মজার তথ্য

স্বপ্ন কি ?

মানুষ জীবনের ৩৩% সময় ঘুমিয়ে কাটায়। স্বপ্ন মানুষের ঘুমন্ত জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। নিদ্রিত অবস্থায় ইন্দ্রিয়গণ স্তিমিত হয় কিন্তু সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয় না। তাই নিদ্রাকালে নানারূপ কল্পনাশ্রয়ী চিন্তা ও দৃশ্য উদিত হয়। এই সব দৃশ্য দেখাকে একরকমের “স্বপ্ন দেখা বলা হয়। নিদ্রিত অবস্থায় জাগ্রত অবস্থার ধারাবাহিকতাকেও স্বপ্ন বলা যেতে পারে। স্বপ্নে নিজের কাছে নিজের নানারকম আবেগ, তথ্য ও তত্ত্বের প্রকাশ ঘটে। স্বপ্নে দেখা দৃশ্য জাগ্রত প্রতক্ষ্যের মতোই স্পষ্ট। আমরা স্বপ্ন দেখি অর্থাৎ স্বপ্ন মূলত দর্শন-ইন্দ্রিয়ের কাজ। স্বপ্ন দেখা অনেকটা সিনেমা দেখার মতো। তবে স্বপ্নে অন্যান্য ইন্দ্রিয়েরও গৌণ ভূমিকা থাকে। জাগ্রত অবস্থায় প্রতক্ষ্যের মাধ্যমে যেমন শরীরে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় তেমনি স্বপ্ন দেখাতেও কিছু না কিছু শারিরীক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

মানুষ স্বপ্ন দেখে কেন ?

ঘুমের মধ্যেও ইন্দ্রিয়গণ বাইরের জগত থেকে সংবেদন গ্রহণ করতে পারে। এ সব সংবেদন ইচ্ছামতো প্রতিরূপে রূপান্তরিত হয়ে স্বপ্নদৃশ্যের সৃষ্টি করতে পারে। তবে স্বপ্নের মূল উপাদান তৈরি হয় স্বপ্নদ্রষ্টার দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা, চিন্তা ও কর্ম থেকে। এবং স্মৃতি থেকে।

মানুষ কতটা স্বপ্ন দেখে ?

জন্মমুহূর্ত থেকেই শিশু দর্শন প্রতিরূপ ব্যতিত অন্যান্য প্রতিরূপের সাহায্যে স্বপ্ন দেখে। জন্মের তিন চার মাস পর থেকেই শিশুরা স্বপ্ন “দেখা” শুরু করে। দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা ঘুম সময়ের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং কৈশোরে ঘুম সময়ের ২০ থেকে ২২ শতাংশ স্বপ্ন দেখে। চল্লিশের পর থেকে ঘুম সময়ের ১২ থেকে ১৫ শতাংশ স্বপ্ন দেখা হয়। মানুষের বয়স যত বাড়তে থাকে স্বপ্ন দেখা তত কমতে থাকে। সুতরাং, প্রাকৃতিক প্রবণতা হচ্ছে মানুষ সর্বস্বপ্নহীন ভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে।

মানুষ কখন স্বপ্ন দেখে ?

ক্লান্ত মানুষ প্রথম দুই ঘন্টা ঘুমানোর সময় স্বপ্ন দেখে না। তখন শরীর পূর্ণ বিশ্রাম নেয়। স্বপ্ন দর্শন কালকে rapid eye movement period বলা হয়। নিদ্রাকালে যে সময় মানুষ স্বপ্ন দেখে না সে সময়টাকে  non rapid eye movement period বলা হয়। ঘুমের মধ্যে প্রায় প্রত্যেক ৯০ মিনিটে,  প্রায় ১০ মিনিট সময় ধরে REM  নিদ্রা দেখা যায়। ঘুমের মধ্যে ৪/৫ বার REM নিদ্রা হয়। অর্থাৎ প্রতিদিন মানুষ অন্তত ৪/৫ টি স্বপ্ন দেখে।


স্বপ্নের প্রকারভেদঃ

চরক-সংহিতা সাত প্রকার স্বপ্নের কথা বলেছে। বৌদ্ধ দর্শনে বর্ণিত হয়েছে ছয় প্রকারের স্বপ্ন।
জীবন চলার পথে মানুষ ভয়,
দুঃস্বপ্ন,
অতীত স্মৃতি,
ইচ্ছাপূরণ,
ভবিষ্যতের বার্তা,
আধ্যাত্মিক নির্দেশনা,
মুর্শিদের উপদেশ,
জ্ঞান লাভ ইত্যাদি নানারকম স্বপ্ন দেখে।

উক্ত স্বপ্ন গুলএর ব্যাখ্যা পরে কোন এক সময় দিব  

স্বপ্ন সম্পর্কিত কিছু মজার তথ্যঃ
০১. সাইকলজিষ্টদের মতে রাতে অনিদ্রা হওয়ার অর্থ আপনি হয়ত অন্য কারো স্বপ্নে জীবিত।

০২. আপনি কখনই একসাথে নাক ডাকতে এবং স্বপ্ন দেখতে পারবেন না।

০৩. গড়ে একজন মানুষ বছরে ১৪৬০টি স্বপ্ন দেখে। অর্থাৎ প্রতি রাতে গড়ে প্রায় ৪ টি।

০৪. প্রতিটি মানুষই স্বপ্ন দেখে। যদি আপনি মনে করেন আপনি স্বপ্ন দেখেন না তার অর্থ হয় আপনি তা মনে রাখতে পারেন না নয়ত আপনি জটিল কোন মানসিক রোগে ভুগছেন।

০৬. মানুষ তার জীবনের প্রায় ৬ বছর স্বপ্ন দেখে কাটায়।

০৭ . আমাদের মষিÍষ্ক কোন চেহারা তৈরী করতে পারে না। আমরা স্বপ্নে যে সব চেহারা দেখি তার সবগুলোই আমরা আমাদের জীবনে কখনও না কখনও দেখেছি। আমাদের জীবনে আমরা পথে ঘাটে অসংথ্য চেহারা দেখি যা মনে রাখতে পারি না। কিন্তু আমাদের সাবকনসাস মাইন্ড তা ধরে রাখে এবং স্বপ্নে তা দেখায়।

০৮. স্বপ্ন দেখার ৫ মিনিটের মধ্যে আমরা তার ৫০শতাংশ ভুলে যাই, ১০ মিনিটের মধ্যে ভুলে যাই প্রায় ৯০ শতাংশ।

০৯. আমরা সাধারনত প্রায় ৯০ থেকে ১৮০ মিনিট স্বপ্ন দেখি যেখানে, গড়ে একটি স্বপ্নের স্থায়িত্ব হয় ১০ থেকে ১৫ মিনিট। সবচেয়ে লম্বা সময় স্বপ্ন দেখি সকালে যার স্থায়িত্ব ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট।

১০. ঈজিপ্সিয়ানরা সর্বপ্রথম ড্রিম ডিকশনারী বা স্বপ্নানুবাদ তৈরী করে, প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে।

১১. শিশুরা সাধারনত ৩ বছর বয়সের আগ পর্যন্ত নিজেদেরকে স্বপ্নে দেখতে পায় না।

তথ্য সুত্র ঃ ইন্টারনেট, সাইফুর রহমান( techtunes),somewhereinblog...

লেখক  

জ্ঞান অন্বেষী 

Sunday, 6 August 2017

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমাবর্ষণ



পৃথিবীর ইতিহাসে এক জঘন্যতম দিন হিসাবে দিবস দুটি সকলের নিকট পরিচিত।৬ আগষ্ট হিরোশিমা দিবস।৯ আগষ্ট নাগাসাকি দিবস। আজ হিরোশিমা আর নাগাসাকি সম্পর্কে কিছু লেখার চেষ্টা করছি। 

৬ আগষ্ট,১৯৪৫, হিরোশিমা 
হিরোশিমা শহরটি জাপানের রাজধানী টোকিও শহর থেকে ৫০০ মাইল দূরে। ৬ আগষ্ট সকাল বেলা তখনো হিরোশিমা জনপথ কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেনি, জীবিকার সন্ধ্যানে কিছু মানুষ ছুটে চলছিল। সকাল ৮.১৫ । হঠাৎ হিরোশিমা শহরের আকাশে দেখা দিলো দৈত্য বিমান বি-২৯ ইনোলো গে । হিরোশিমা নগরীর উপরে ছুড়ে মারলো আনবিক বোমা "লিটল বয়"। মূহুর্তের মাঝে সব কিছু লন্ড ভন্ড হয়ে গেল। ধ্বংস লীলায় পরিনত হলো গোটা শহর। 



পরিনতি কি হয়েছিল 
হিরোশিমায় বোমা বিস্ফোরনের স্থানটি ছিল বানিজ্যিক ও অফিস আদালতের স্থান। বিষ্ফোরনের সাথে সাথে ৫০০ মিটার বৃত্তের মাঝে আলীশান দালান চোখের পলকে নেতিয়ে পড়ে। ৫ বর্গমাইল এলাকা ছাই ও ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়। বিস্ফোরনের সময় নগরীতে লোকসংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ৫০ হাজার। যার মাঝে সেই সময় থেকে ১০ আগষ্ট পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৬৬১ জন। যার মাঝে সামরিক লোক মৃত্যুবরন করে প্রায় ২০,০০০ জন। 
হিরোশিমা prefectural স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমান, বিস্ফোরণ দিনে যারা মারা গেছে তাদের মাঝে 60% ফ্ল্যাশ বা অগ্নিশিখা পোড়া, পতনশীল ধ্বংসাবশেষ থেকে 30% এবং অন্যান্য থেকে 10%। 
একটি মার্কিন গবেষনায় 15-20% বিকিরণ অসুস্থতা, থেকে 20-30% ফ্ল্যাশ পোড়া ও অন্যান্য আঘাত থেকে এবং 50-60% অসুস্থতা দ্বারা মারা গেছে। উভয় শহরে মৃতের অধিকাংশই ছিল বেসামরিক নাগরিক। 



ধ্বংসপ্রাপ্ত হিরোশিমা নগরী

লিটল বয় 
হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত বোমটির নাম "লিটল বয়"। নিজেদের প্রয়োজনে এটি নিক্ষেপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। তিনি ছিলেন আকারে ছোট তাই তার নাম দেয়া হয় "লিটল বয়"। কিন্তু বোমা হামলা নির্দেশ দেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হেনরি ট্রুম্যান। বোমা বহনকারী বিমানটি ছিল বোয়িং বি-29 Superfortress Enola গে , আর সেই বিমানের পাইলট ছিলেন কর্নেল পল ​​। আর হামলা পরিচালনা করেন Tibbets এর 393rd বমবার্ডমেন্ট স্কোয়াড্রন, ভারি অফ, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিমান বাহিনী । এটি ছিল প্রথম আণবিক বোমা যা অস্ত্র হিসাবে হিসাবে ব্যবহৃত হয়। 


                         
এটিই প্রথম পারমানবিক বোমা যা মানুষ মারার জন্য ব্যবহার করা হয়ে ছিল

"Little Boy" model. 
প্রকারঃ পারমানবিক অস্ত্র 
উৎপত্তি স্থানঃ যুক্তরাষ্ট্র 
ওজনঃ 9.700 পাউন্ড (4,400 কেজি) 
লম্বাঃ 120 ইঞ্চি (3.0 মিটার) 
ব্যাসরেখাঃ 28 ইঞ্চি (710 মিমি) [1] 
চার্লসের ফলনঃ 13-18 kt (54-75 TJ 



ইনোলো গে বিমানের পাইলট কর্নেল পলসহ অন্যান্য ক্ররা 

হিরোশিমার বর্তমান অবস্থা 
১৯৪৯ সালে হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি পার্ক নির্মান করা হয়, হিরোশিমা Prefectural শিল্প উন্নয়ন হল, closest বোমা বিস্ফোরণ এর স্থানে জীবিত ভবন, Genbaku অট্টালিকা বা পরমাণু অট্টালিকা , হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি জাদুঘর ১৯৫৫ সালে নির্মান হয়। 
হিরোশিমা ১৯৪৯ সালে জাপানি পার্লামেন্ট দ্বারা শান্তি শহরের ঘোষিত হয়। হিরোশিমা উপসাগরকে ঝিনুকের আঁধার বলা হয়। সরকার আর জনগনের চেষ্টায় এই শহর এখন হয়ে শান্তি আর উন্নয়নের নগরী।

Genbaku অট্টালিকা বা পরমাণু অট্টালিকা 
৯ আগষ্ট, ১৯৪৫, নাগাসাকি 
জাপানের আরেকটি ব্যস্ত শহর নাগাসাকি। স্থানীয় সময় রাত ৩টা ৪৭মিনিট। নগরীর সবাই তখন গভীর ঘুমে বিভোর। সেই ঘুম থেকে অনেকেই চিরনিদ্রায় চলে গিয়েছে। হিরোশিমার পুনরাবৃত্তি হলো নাগাসাকিতে। নিক্ষিপ্ত হলো আনবিক বোমা" ফ্যাটম্যান"। নিমিশেই ঘুমন্ত নগরীকে পরিনত করলো মৃত্যু নগরীতে। 



নাগাসাকির পরিনতি 
আগস্ট 9, 1945 তারিখে, নাগাসাকিতে ছিল পারমাণবিক বোমা হামলা দ্বিতীয় লক্ষ্য । আনুমানিক ৪০,০০০ মানুষ বোমা হামলায় নিহত হয়েছে । পাশাপাশি ৭৪,৯০৯ আহত এবং অন্য কয়েক শো হাজার বিপর্যয় এবং অন্যান্য অসুস্থতা বিকিরণ দ্বারা ফলে অসুস্থ এবং মারা যায়। এই বোমা ছিল "লিটল বয়"থেকেও বেশি ধ্বংসাত্মক । কিন্তু হিরোশিমার মতো বানিজ্যিক এলাকায় না ফেলে ফেলা হয় একটি উপত্যকায়। তবুও ক্ষতি ছিল একই পরিমাণ । 
ফ্যাটম্যান 


মূল অস্ত্র এর Mockup 
প্রকারঃ পারমানবিক অস্ত্র 
উৎপত্তি স্থানঃ যুক্তরাষ্ট্র 
ওজনঃ 10.213 পাউন্ড (4,633 কেজি) 
লম্বাঃ 10.7 ফুট (3.3 মিটার) 
ব্যাসরেখাঃ 5 ফুট (1.5 মিটার) 
চার্লসের ফলনঃ 21 kt (88 TJ) ~ ডিনামাইট 75 মিলিয়ন লাঠি। 
বহনকারী বিমানের নামঃ বি-২৯ সুপারকোর্টস; অন্য নাম বক্সকার। 
বিমানের পাইলটঃ মেজর চার্লস ডব্লু সুইনি।

হিরোশিমা-নাগানাকিতে পারমানবিক হামলা প্রভাব 
প্রতিবছর ৬ ও ৯ আগষ্ট ঘুরে ঘুরে আসে। আমেরিকার নির্মমতার কথা জাপানিরা কখনো ভুলতে পারবে না। লিটল বয় এর ধ্বংসজজ্ঞ এতটাই ছিল যে, ২ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কাঠের যত স্থাপনা ছিল সবই মাটির সাথে মিশে গিয়েছে। চোখের নিমিশে পুরে ছাই হয়ে গিয়েছে শহরের অধিকাংশ স্থান। ৬৬ বছর পরেও হিরোশিমা নাগাসাকি শহরের মানুষেরা তেজস্ক্রিয়তার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এখনো দেখা যায় তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে পঙ্গুত্ব, বিকলাঙ্গসহ নানা প্রকার রোগব্যাধী। হিরোশিমায় ঐ বছর শেষ পর্যন্ত মারা যায় প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষ আর নাগাসকিতে মারা যায় প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। 


বোমার প্রভাবে আক্রান্ত শিশু 
পরিশেষে 


হিরোশিমা নাগাসকি দিবস উপলক্ষে আমরা আনবিক ধ্বংস তান্ডব চিরতরে বন্ধ করার জন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নিকট আবেদন জানাই। বিশ্ববাসী যুদ্ধ নয়, শান্তি কামনা করে। কারণ, যুদ্ধ ধ্বংসজজ্ঞের পাহাড় সমৃদ্ধ করে, হানাহানির তীব্রতার ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটে , মানুষ হারিয়ে ফেলে মানবতা। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ চায় নিরাপদে জীবন যাবন করে পরিবার-পরিজন নিয়ে সমাজ তথা দেশের উন্নতি ঘটাতে। পরিশেষে আবারো জানাই আনবিক বোমায় নিহত হিরোশিমা ও নাগাসাকিবাসী ও তাদের আত্মীয় স্বজন এবং স্থায়ী পঙ্গুত্ববরনকারীদের প্রতি সমবেদনা । 

সূত্রঃ 
১. নয়াদিগন্ত, শতদল বড়য়া 
২.উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে 
৩. অ্যাফেয়ার্স ,আগষ্ট,১১ 
৪.নতুন বিশ্বকারেন্ট 
৫.আর.হক

লেখক  

জ্ঞান অন্বেষী  

Monday, 24 July 2017

বাস্তবতা কী? বা বাস্তব অস্তিত্ব কী?(What is the reality?)



আপনার ভাবনার সাথে বাস্তবতা বিষয় কত টুকু মিলাতে পারেন দেখা যাক। আসুন দেখে আসি বাস্তবতা কে What is the reality?

জগতে যার অস্তিত্ব আছে তাই বাস্তব, জগতে যা বাস্তব তাই হলো বাস্তবতা। কথাটা কেমন যেন একটু সোজাসাপ্টা শোনাচ্ছে। আসলে বাস্তবতা শব্দটি এতটা সোজাসাপ্টা নয়। এই বিষয়টাকে একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। প্রথমে ডায়নোসরদের কথা বিবেচনা করি, অনেক অনেক আগে এদের অস্তিত্ব ছিল কিন্তু এখন আর নেই। বর্তমানের প্রেক্ষাপটে এরা কি বাস্তব? আকাশের তারাদের কথা বিবেচনা করি, আজকের দিনে আমরা কোনো একটা তারাকে যে রূপে দেখছি এটি সত্যিকার অর্থে সেই রূপে নেই। তারার বুক থেকে আলোক রশ্মি মুক্তি পেয়ে হাজার হাজার বছর ধরে মহাশূন্যে ভ্রমণ করে তারপর আমাদের চোখে এসে লাগে। ভ্রমণপথের এই সময়ের মাঝে তারার পরিবর্তন হয়ে গেছে অনেক। হয়তোবা তারাটি বিস্ফোরিত হয়ে মরেও গেছে এতদিনে। এমন পরিস্থিতিতে আকাশের তারারা কি বাস্তব?
এগুলো নাহয় অতীতের জিনিস, এদের বাস্তবতা কিছুটা ঘোলাটে। বর্তমানের কোনো কিছুর বাস্তবতা আমরা কীভাবে নির্ধারণ করি? প্রথম শর্ত হলো তার অস্তিত্ব থাকতে হবে। তার অস্তিত্ব আছে এটা কীভাবে নির্ধারণ করি? আমাদের ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে নির্ধারণ করতে পারি কোনো জিনিসের অস্তিত্ব আছে নাকি নেই। বিশটিরও অধিক ইন্দ্রিয়ের মধ্যে আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় বেশি শক্তিশালী। পঞ্চ ইন্দ্রিয় হচ্ছে মানুষের প্রধান পাঁচটি অনুভূতি- দৃষ্টি শক্তি, ঘ্রাণশক্তি, শ্রবণ শক্তি, স্পর্শের অনুভূতি ও স্বাদ গ্রহণের অনুভূতি। এগুলো ব্যবহার করে সাদামাটাভাবে কোনো কিছুর অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করেই নোনতা লবণ ও মিষ্টি চিনি, শক্ত পাথর ও নরম কাদা, শুকনো কাঠ ও কচি ঘাস, ক্যাটকেটে হলুদ কাপড় ও নীল আকাশের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে পারি।

কিন্তু ‘অস্তিত্ব’ বা ‘বাস্তবতা’র সংজ্ঞা জন্য এতটুকু কি যথেষ্ট? যাদেরকে পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে শনাক্ত করা যায় শুধুমাত্র তাদেরকেই বাস্তব বলবো? অন্য সবকিছু কি তালিকা থেকে বাদ?

ব্যাপারটাকে আরেকটু বিস্তৃত করি। খুব দূরের কোনো গ্যালাক্সির কথা বিবেচনা করি। এতোই দূরের যে খালি চোখে তাকে দেখাই যায় না। কিংবা অতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়ার কথা, এদেরকেও খালি চোখে দেখা অসম্ভব। তাহলে কি বলতে পারবো যেহেতু তাদের দেখা যায় না সেহেতু তারা অবাস্তব? না, এমনটা বলা যাবে না। আমরা আমাদের ইন্দ্রিয়কে আরো বিস্তৃতভাবে ব্যবহার করতে পারি। ইন্দ্রিয়কে বিস্তৃত করতে

বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির সাহায্য নিতে পারি। যেমন দূরের গ্যালাক্সি দেখতে টেলিস্কোপের সাহায্য নিতে পারি কিংবা
ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে জানতে মাইক্রোস্কোপের সাহায্য নিতে পারি।
আমরা যেহেতু টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে জানি তাই তারা যে জিনিসকে সত্য বলে সাক্ষ্য দিবে সে জিনিসকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি। এক্ষেত্রে দুটি যন্ত্রের উভয়ই আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করে কাজ করে। অন্যদিকে আমাদের চোখও আলোক তরঙ্গ ব্যবহার করেই দেখার কাজ সম্পন্ন করে। তাই টেলিস্কোপ ও মাইক্রোস্কোপ যদি দূরের কোনো গ্যালাক্সি কিংবা ক্ষুদ্র কোনো ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয় তাহলে গ্যালাক্সি বা ব্যাকটেরিয়াকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।

রেডিও তরঙ্গের কথা বিবেচনা করি, চোখের মাধ্যমে তাদের দেখতে পাই না, কানের মাধ্যমে শুনতে পারি না। তারা কি বাস্তব? তাদের কি অস্তিত্ব আছে? হয়তো আমরা দেখতে বা শুনতে পাই না, কিন্তু বিশেষ কোনো যন্ত্র যেমন টেলিভিশনের মাধ্যমে তাদের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারি। সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে রেডিও তরঙ্গের মাধ্যমে সিগনাল প্রেরিত হয়, যা পরবর্তীতে টেলিভিশনের এন্টেনায় ধরা পড়ে, টেলিভিশন সেই সিগনালকে রূপান্তরিত করে পর্দায় উপস্থাপন করে, যা আমরা দেখতে পাই ও শুনতে পারি। এই হিসেবে যদিও আমরা রেডিও তরঙ্গ শুনতে কিংবা দেখতে পাই না, তারপরেও আমরা ধরে নিতে পারি এই তরঙ্গের অস্তিত্ব আছে। এটি বাস্তব।

অদৃশ্য বস্তুর বাস্তবতা অনুধাবনের চমৎকার একটি উদাহরণ হতে পারে মোবাইল ফোন। নেটওয়ার্কের সাহায্য নিয়ে মোবাইলের মোবাইলের মাধ্যমে কথা বলা কিংবা ইন্টারনেট চালানো যায়। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন টাওয়ার হতে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক সরবরাহ করা হয়। এই তরঙ্গও আমরা দেখতে কিংবা শুনতে পাই না কিন্তু মোবাইল, মডেম ও রাউটারের মাধ্যমে তাদের ব্যবহার করে নানা কাজ করছি। যেহেতু মোবাইলের কার্যপ্রণালী জানি এবং মোবাইল তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে সাক্ষ্য দিচ্ছে তাই তাদেরকে বাস্তব বলে ধরে নিতে পারি।
ডায়নোসরের কাছে ফিরে যাই। আজকের যুগে তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই। তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের চিৎকার চেঁচামেচি কখনো শুনিনি, তাদের ভয়ে কখনো দৌড়ে পালাতে হয়নি। তাহলে কীভাবে জানতে পারলাম তারা একসময় এই পৃথিবীতে রাজত্ব করে বেড়িয়েছিল? টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু যদি থাকতো তাহলে মেশিনে চরে অতীতে গিয়ে দেখতে পারতাম আসলেই তাদের অস্তিত্ব ছিল কিনা। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, টাইম মেশিন নামে কোনো কিছু নেই।

এদিক থেকে তাদের অস্তিত্ব শনাক্ত করতে অসমর্থ হলেও অন্য আরেক দিক থেকে কিন্তু ঠিকই তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়। আমাদের কাছে আছে ফসিল রেকর্ড, এবং এসব ফসিল আমরা খালি চোখেই দেখতে পাই। ফসিল কীভাবে গঠিত হয় এবং ফসিলের স্বভাব চরিত্র ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে আমরা জানি। এদের মাধ্যমে ইতিহাসের কোন সময়ে কী হয়েছিল তা অনুধাবন করতে পারি। এমনকি কোটি কোটি বছর আগে কী হয়েছিল সে সম্পর্কেও ধারণা লাভ করতে পারি।

আমাদের ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে যদিও সরাসরি এদের দেখতে পাই না কিন্তু অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে এটা অনুধাবন করতে পারি যে ডায়নোসরদের অস্তিত্ব ছিল। তাদের রেখে যাওয়া দেহের ছাপ দেখতে পাই,
এমনকি হাত দিয়ে ছুঁয়েও দেখতে পারি। কোনো কিছুকে বাস্তব হতে হলে তাকে উপস্থিত থাকতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনুপস্থিত থেকেও সে তার বাস্তবতার জানান দিতে পারে। কিন্তু অবশ্যই তার বাস্তবতার পক্ষে প্রমাণ থাকতে হবে। সরাসরি হোক কিংবা প্রায়োগিকভাবে হোক, কোনো একভাবে ইন্দ্রিয়ে অনুভূতি জাগাতে সক্ষম হতে হবে।
আমাদের কাছে টাইম মেশিন না থাকলেও ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে টেলিস্কোপকে টাইম মেশিন হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। আমরা যা দেখি তা মূলত বস্তু থেকে আসা আলোক রশ্মি, আর আলোক রশ্মি বস্তু থেকে আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগে। এমনকি কেউ যদি তার পাশাপাশি বসে থাকা বন্ধুর চেহারার দিকে তাকায়, ঐ চেহারা থেকেও আলো আসতে কিছু পরিমাণ সময় লাগবে। যত ক্ষুদ্রই হোক সময় ঠিকই লাগবে। এদিক থেকে আমরা যা দেখছি তা আসলে অতীত। প্রতিনিয়ত অতীতের জিনিস দেখে চলছি।

মূলত সব তরঙ্গেরই ভ্রমণ পথে কিছুটা সময় ব্যয় হয়। যেমন শব্দ তরঙ্গ। শব্দ তরঙ্গের বেগ আলোক তরঙ্গের বেগের চেয়ে অনেক কম। কোথাও বজ্রপাত হলে আমরা প্রথমে আলোর ঝিলিক দেখতে পাই, পরে জোরে ঠাট ঠাট শব্দ শুনতে পাই। মূলত আলোর ঝিলিক ও শব্দ একই সময়ে উৎপন্ন হয়। শব্দের বেগ আলোর বেগের চেয়ে কম বলে আমাদের কানে এসে পৌঁছুতে দেরি লাগে। এই হিসেবে আমরা অধিকতর অতীতের শব্দ শুনছি। পৃথিবীর মাঝে কোনো ঘটনা ঘটা মাত্রই আমরা তা দেখতে পাই। আলো আসতে খুব একটা সময় লাগে না। আলো প্রতি সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে পারে। অন্যদিকে শব্দ প্রতি সেকেন্ডে আধা কিলোমিটারও অতিক্রম করতে পারে না।
আমাদের আশেপাশের কোনো বস্তু থেকে আলো আসতে যদিও সময় অল্প লাগে কিন্তু আকাশের নক্ষত্র (তারা) ও গ্যালাক্সির বেলায় কিন্তু অনেক সময় লাগে। কারণ নক্ষত্রেরা পৃথিবী থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। এমনকি আমাদের নিজেদের নক্ষত্র সূর্য থেকেও আলো আসতে ৮ মিনিট সময় লাগে। এই মুহূর্তে সূর্য যদি বিস্ফোরিত হয়ে ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে ৮ মিনিটের আগে তা আমাদের ইন্দ্রিয়ে ধরা পড়বে না।

সূর্যের পর পৃথিবী থেকে সবচেয়ে কাছে অবস্থিত নক্ষত্রটির নাম প্রক্সিমা সেন্টারি (Proxima Centauri)। এটি থেকে আলো আসতে ৪ বছর লেগে যায়। আজকে ঐ নক্ষত্রকে আমরা যে অবস্থায় দেখছি তা আসলে চার বছরের আগের অবস্থা। ২০১৬ সালে যা দেখছি তা ঘটে গিয়েছে ২০১২ সালেই।

নক্ষত্রের পর আসে গ্যালাক্সি, অনেক অনেক নক্ষত্রের সমাবেশে গ্যালাক্সি গঠিত হয়। আমাদের সূর্য মানে আমরাও একটি গ্যালাক্সির অংশ। আমাদের গ্যালাক্সিটির নাম মিল্কিওয়ে (Milky Way)। বাংলায় একে ‘আকাশগঙ্গা’ বলেও ডাকা হয়ে থাকে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি থেকে সবচেয়ে কাছের গ্যালাক্সিটি হলো এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সি। এটি থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে আড়াই মিলিয়ন বছর সময় লাগে। গ্যালাক্সির পরে আসে ক্লাস্টার (Cluster) স্তবক বা গুচ্ছ। অনেকগুলো গ্যালাক্সি একত্র হয়ে গ্যালাক্সি-ক্লাস্টার গঠন করে। ‘স্টেফানের পাঁচক’ (Stephan’s Quintet) নামে একটি ক্লাস্টার আছে। এডওয়ার্ড স্টেফান নামে একজন জ্যোতির্বিদ পাঁচটি গ্যালাক্সি মিলে তৈরি এই ক্লাস্টারটি আবিষ্কার করেছেন বলে তার নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। হাবল টেলিস্কোপের তোলা ছবির মাধ্যমে দেখা যায় এই ক্লাস্টারের একটি গ্যালাক্সির সাথে আরেকটি গ্যালাক্সির সংঘর্ষ হচ্ছে। ছবিতে এই সংঘর্ষ খুব দৃষ্টিনন্দন হিসেবে ধরা দেয়। কিন্তু দূর থেকে দেখা নান্দনিক এই দৃশ্যের ঘটনা ঘটে গেছে আজ থেকে ২৮০ মিলিয়ন বছর আগেই। হাবল টেলিস্কোপের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থেই আমরা টাইম মেশিনে ভ্রমণ করছি। টেলিস্কোপের মাধ্যমে মিলিয়ন মিলিয়ন বছর আগের ঘটনা দেখছি।

এবার অন্যদিক থেকে বিবেচনা করি। ঐ ক্লাস্টারের কোনো একটি গ্যালাক্সিতে যদি এলিয়েনের অস্তিত্ব থাকে এবং ঐ এলিয়েন যদি খুব শক্তিশালী টেলিস্কোপ তাক করে আমাদের পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করে তাহলে এই মুহূর্তে কী দেখতে পাবে? এই মুহূর্তে কিন্তু গুগল আর ফেসবুক ব্যবহারকারী কোনো মানুষকে দেখতে পাবে না। তারা দেখবে আজ থেকে মিলিয়ন বছর আগের ডায়নোসরদের রাজত্ব। টেলিস্কোপ এখানে টাইম মেশিন হিসেবে কাজ করছে এবং পৃথিবীতে ডায়নোসরদের বাস্তবতার জানান দিচ্ছে।

কথার পিঠে কথা চলে আসে। সত্যি সত্যিই কি এলিয়েনের অস্তিত্ব আছে? আমরা তাদেরকে কখনো দেখিনি, তাদের কথাবার্তা কখনো শুনিনি, কোনো ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করিনি। তাহলে তারা কি বাস্তবতার অংশ? এর উত্তর এখনো কেউ জানে না। যদি কোনোদিন তাদের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় তাহলেই তারা বাস্তবতার অংশ হিসেবে গণ্য হবে। কোনো একদিন কেউ যদি অতি মাত্রায় শক্তিশালী কোনো টেলিস্কোপ তৈরি করে যা দিয়ে খুব দূরের কোনো গ্রহের প্রাণীদেরকেও পর্যবেক্ষণ করা যায়, তাহলে হয়তো আমরা এলিয়েনের অস্তিত্ব পর্যবেক্ষণ করতে পারবো। কিংবা এমনও হতে পারে কোনো রিসিভারে এলিয়েনদের পাঠানো বার্তা ধরা পড়লো তখন হয়তো তাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

মডেলঃ কল্পনার পরীক্ষা-নিরীক্ষা

যেসকল জিনিসের বাস্তবতা ইন্দ্রিয় দিয়ে সরাসরি অনুভব করা যায় না, সেসকল জিনিসের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে বিজ্ঞানীরা একটি পদ্ধতির আশ্রয় নেন। পদ্ধতিটির নাম ‘মডেল’। এই পদ্ধতিটি খুব বেশি পরিচিত নয়। মডেল হচ্ছে বৈজ্ঞানিক চিন্তা ভাবনার সত্যিকার মাধ্যম। আমাদের আশেপাশের বাস্তব জগতের কোনো একটা ক্ষেত্রে কী ঘটে চলছে তার একটা সুচিন্তিত মতামত হচ্ছে মডেল। আমরা হয়তো ভাবি আমাদের আশেপাশের এইখানটাতে কী হচ্ছে ঐখানটাতে কী ঘটে চলছে। চুলগুলো কীভাবে লম্বা হচ্ছে, নখগুলো কীভাবে বড় হচ্ছে। মনে মনে কিছু একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি। এই ব্যাখ্যাটাই হচ্ছে মডেল। এই মডেল সঠিকও হতে পারে আবার ভুলও হতে পারে।
বিজ্ঞানীরা জীব জগৎ ও জড় জগৎ নিয়ে এভাবেই বৈজ্ঞানিক মডেল উপস্থাপন করেন। মডেল প্রদানের পর ঐ মডেলকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। মডেল হতে পারে কাঠ বা প্লাস্টিকের তৈরি কোনো রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি কিংবা হতে পারে কোনো গাণিতিক সমীকরণ কিংবা হতে পারে কম্পিউটারের কোনো সিমুলেশন।

এই মডেল যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে ফলাফল হিসেবে কী দেখার কথা বা কী শোনার কথা কিংবা কোনো যন্ত্রে কী প্রতিক্রিয়া হবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। মাঝে মাঝে মডেলের বেলায় গাণিতিক হিসাব নিকাশ করেও গাণিতিক ফলাফল কী পাবার কথা তা নির্ধারণ করা হয়। এরপর মডেলে দাবি করা কথাগুলো যাচাই করা হয় এবং এই মডেল সঠিক হয়ে থাকলে এটির ফলে ভবিষ্যতে কী হবে তা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ কোনো কিছু সম্পর্কে এটি ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে কিনা তা যাচাই করা হয়। সঠিক হয়ে থাকলে কী দেখতে পাবার কথা বা কী শুনতে পাবার কথা কিংবা কী উপলব্ধি করতে পারার কথা তা মিলিয়ে দেখা হয়। যদি ভবিষ্যদ্বাণী মিলে যায় তাহলে মডেলকে আপাতত
সঠিক হিসেবে ধরে নেয়া হয় এবং আমরা আমাদের বিশ্বাসকে আরো দৃঢ় করতে পারি যে, মডেলে যা দাবি করা হচ্ছে তা আসলে বাস্তবতার অংশ।

উৎরে যাওয়া মডেলকে পরবর্তীতে আরো পরীক্ষা নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যত বেশি পরীক্ষায় পাশ করবে তত বেশি পরিমাণ নির্ভুল ও তত বেশি পরিমাণ বাস্তব বলে বিবেচিত হবে। যদি মডেলের ভবিষ্যদ্বাণী না মিলে তাহলে এটিকে বাতিল ও ভুল বলে গণ্য করা হয় কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তাকে পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে হয়। অন্য উপায়েও যদি এর সত্যতা প্রমাণিত না হয় তাহলে মডেলটিকে সংশোধন করে আবারো পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করা হয়। বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনার বেলায় কোনো ছাড় নেই।

বৈজ্ঞানিক মডেল নিয়ে একটি উদাহরণ তুলে ধরছি। আমরা জানি বংশগতির একক জিন, DNA নামক এক প্রকার তন্তু দিয়ে গঠিত। আজকের যুগে DNA সম্পর্কে আমরা অনেক কিছু জানি। DNA কী, কীভাবে কাজ করে, তার নাড়ি-নক্ষত্র সবই জানি। কিন্তু DNA’র গঠন কেমন তা দেখতে পারি না। এমনকি খুব শক্তিশালী মাইক্রোস্কোপের সাহায্যেও এর গঠন দেখা যায় না। DNA সম্পর্কে আমরা যা জানি তার প্রায় সবই এসেছে কল্পনায় তৈরি করা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক মডেল ও মডেলের নানা পরীক্ষা নিরীক্ষার মাধ্যমে।

মানুষ যখন DNA সম্পর্কে কিছুই জানতো না, এমনকি DNA -র নামও শুনেনি তখনও জিন সম্পর্কে অনেক তথ্য মানুষের জানা ছিল। দেড়শো বছর আগের কথা, ইতালির পাশের দেশ অস্ট্রিয়ায় গ্রেগর জোহান মেন্ডেল নামে একজন ধর্মযাজক বাস করতেন। মেন্ডেল তার গির্জার বাগানে মটরশুঁটি গাছ নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছিলেন। মটরশুঁটি বীজ নিয়ে তার মনে একটা ভাবনা খেলা করায় তিনি যত্ন নিয়ে বাগানে বেশ কিছু মটরশুঁটি রোপণ করলেন, এবং পরিচর্যা করে বড় করতে লাগলেন। যে যে গাছ ফল হিসেবে সবুজ বা হলুদ কিংবা উভয়ের মিশ্রণ দিয়েছে তাদের গুনে রাখলেন। এ বীজগুলো থেকে আবার চারা তৈরি করে ঐ চারার বীজের রঙ পর্যবেক্ষণ করলেন। এভাবে কয়েক প্রজন্ম ধরে পর্যবেক্ষণ করে গেলেন। পর্যবেক্ষণের ফলাফল থেকে তিনি চমৎকার একটি সূত্র খুঁজে পান।



চিত্রঃ মগ্ন মেন্ডেল। চিত্রঃ Charley Harper Art Studio

তিনি খেয়াল করে দেখলেন মটরশুঁটি গাছের বৈশিষ্ট্যগুলো চমৎকার একটি গাণিতিক নিয়ম মেনে বংশ পরম্পরায় বয়ে চলে। মানুষের দিকে খেয়াল করলে দেখা যাবে সন্তানরা দেখতে শুনতে কিংবা অন্য কোনো
বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে প্রায় সময় তাদের বাবা-মায়ের মতো হয়। মেন্ডেলের আবিষ্কার করা এই জিনিসটার জন্যই সন্তানেরা বাবা-মায়ের মতো হয়।

মেন্ডেল কিন্তু কোনো জিনকে কখনো চোখে দেখেননি বা ছুঁতেও পারেননি। কিন্তু তারপরেও তিনি অনুধাবন করেছিলেন ‘কিছু একটা’ জিনিস আছে যা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে স্থানান্তরিত হয়। এর সবগুলোই তিনি করেছিলেন গণনা ও হিসাব নিকাশের মাধ্যমে। মটরশুঁটি গাছের সবুজ ও হলুদ বীজ নিয়ে তিনি একটি মডেল প্রদান করেছিলেন। এই মডেল যদি সঠিক হয়ে থাকে তাহলে সবুজ ও হলুদ মটরশুঁটিকে বিশেষ উপায়ে নিষিক্ত করা হলে এক পর্যায়ে সবুজ মটরশুঁটির তিনগুণ হলুদ মটরশুঁটি পাওয়া যাবে। এবং তার পরীক্ষার ফলাফলে ঠিক এমনটাই পাওয়া গিয়েছিল।

বিপ্লবী এই আবিষ্কারটা তিনি করেছিলেন তার কল্পনার মডেলের মাধ্যমেই। এরকম অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও বিপ্লবাত্মক আবিষ্কার হয়েছে মডেলের মাধ্যমে। মেন্ডেলের কাছে আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল না। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখার কোনো উপায় ছিল না। এসব সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চমৎকার একটি আবিষ্কার করে ফেলেছিলেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা মেন্ডেলের মডেলের আরো উন্নয়ন করেন। মটরশুঁটি বীজের পাশাপাশি অন্যান্য জীবের উপরও এই সূত্র প্রয়োগ করেন।

মেন্ডেল DNA দেখতে পাননি। DNA-র আকার আকৃতি কেমন আজকের যুগে আমরা তা জানি। শুধু আকার আকৃতিই না, আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে DNA সম্পর্কে অনেক অনেক কিছুই জানা সম্ভব হয়েছে।

DNA-র সত্যিকার আকৃতি কেমন তা জানতে পেরেছি বিজ্ঞানী জেমস ওয়াটসন ও ফ্রান্সিস ক্রিকের কল্যাণে। ওয়াটসন ও ক্রিকের পাশাপাশি তাদের আগে ও পরে এই বিষয় নিয়ে কাজ করা অন্যান্য বিজ্ঞানীদেরও অবদান আছে। ওয়াটসন আর ক্রিকও কিন্তু DNA-র আকৃতি নিজেদের চোখে দেখননি। তারাও গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কারটি করেছিলেন তাদের কল্পিত মডেল প্রদানের মাধ্যমে এবং ঐ মডেলের সত্যাসত্য যাচাইয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে।
তাদের মডেল বাস্তবায়নের জন্য লোহা ও কাঠ ব্যবহার করে DNA-র আনুমানিক গঠনের একটি রেপ্লিকা বা প্রতিলিপি তৈরি করেছিলেন। এই মডেল সঠিক হলে কেমন ফলাফল পাওয়া যাবে তাও গবেষণা-হিসাব-নিকাশ করে বের করলেন। অর্থাৎ কিছু একটা ভবিষ্যদ্বাণী করলেন।

রোজালিল্ড ফ্রাঙ্কলিন ও মরিস উইলকিন্স বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে ওয়াটসন ও ক্রিকের দাবী পরীক্ষা করে দেখেছিলেন। তারা এক্স-রে বীম দিয়ে বিশুদ্ধ DNA ক্রিস্টালের ছবি তুললেন। তাদের তোলা ছবিতে DNA-র গঠন আর ওয়াটসন ও ক্রিকের ভবিষ্যদ্বাণী করা DNA-র গঠন ঠিক ঠিক মিলে যায়। এর ফলে একটি কল্পিত মডেল যুগান্তকারী এক আবিষ্কারে পরিণত হয়। ওয়াটসন ও ক্রিকের এই আবিষ্কার ছিল মূলত মেন্ডেলেরই আবিষ্কারের আধুনিক রূপ।



চিত্রঃ ওয়াটসন ও ক্রিক। অলংকরণঃ Dave McKean

আমরা জানতে চেয়েছিলাম বাস্তবতা কী, তিনটি ভিন্ন উপায়ে বাস্তবতা নির্ণয়ের পদ্ধতি সম্বন্ধে জানলাম। প্রথমটি হচ্ছে, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে সরাসরি কোনোকিছুকে উপলব্ধি করা। দ্বিতীয়টি হচ্ছে বিশেষ কোনো যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। অর্থাৎ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই পরোক্ষভাবে উপলব্ধি করা। শেষের পদ্ধতিটি হচ্ছে মডেল তৈরি করে এবং পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা ঐ মডেলের সত্যাসত্য নির্ণয়ের মাধ্যমে আরো পরোক্ষভাবে ইন্দ্রিয়ের উপলব্ধির উপযোগী করা। মানে ঘুরেফিরে এক বা একাধিক ধাপ পার হয়ে সেটি শেষমেশ ইন্দ্রিয়তে গিয়েই শেষ হচ্ছে। যে পদ্ধতিতেই হোক, বেলা শেষে ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই বাস্তবতা নির্ধারিত হচ্ছে।

তাহলে তার মানে কি এই, যা নির্ণয়-নির্ধারণ করা যাবে তা-ই শুধু বাস্তব আর বাকি সব অবাস্তব? তাহলে সুখ-দুঃখ, আনন্দ-ভালোবাসার মতো জিনিসগুলো কোথায় যাবে? তারা কি অবাস্তব?

অবশ্যই এরা বাস্তব। কিন্তু এই আবেগ-অনুভূতিগুলো নির্ভর করে মস্তিষ্কের উপর। মস্তিষ্কের কর্মকাণ্ডের উপর তাদের তীব্রতার পরিমাণ নির্ভর করে। আবার সব প্রাণীর মস্তিষ্কে সব ধরনের আবেগ-অনুভূতি নেই। মানুষের মস্তিষ্ক কিংবা অন্যান্য উন্নত প্রাণী যেমন- শিম্পাঞ্জী, কুকুর, তিমি মাছ ইত্যাদি প্রাণীদের তীব্র আবেগ অনুভূতি আছে। ইট-পাথর পাথরের কোনো আনন্দ-বেদনা নেই, পাহাড়-পর্বতেরা কখনো প্রেমে পড়ে না।

এই অনুভূতিগুলো মস্তিষ্কে তখনই বাস্তব হবে যখন মস্তিষ্ক এই অনুভূতি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করবে। অভিজ্ঞতা লাভ করার আগ পর্যন্ত এর সত্যিকার রূপ সম্বন্ধে মস্তিষ্ক কিছুই জানবে না। একটা উদাহরণ দেই। একটি ছেলে বা মেয়ের কথা বিবেচনা করি, যে তার জীবনে এখন পর্যন্ত একটাও আম খেয়ে দেখেনি। বই-পুস্তকে অনেকবার পড়েছে ও অনেকের কাছে শুনেছে, পাকা টসটসে হিমসাগর আম অনেক সুস্বাদু হয়। বইতে আরো পড়েছে এই জাতের আম অনেক মিষ্টি ও সুগন্ধিযুক্ত হয়, কিন্তু খেয়ে দেখেনি কখনো। সে বই-পুস্তকে যত বিবরণই পড়ুক, যত প্রশংসাই শুনুক, পাকা আমের সত্যিকার স্বাদ সম্পর্কে তার মস্তিষ্ক কিন্তু কিছুই জানতে পারছে না। মস্তিষ্কে অনুভূতি তখনই বাস্তব হবে যখন ঐ অনুভূতি সম্পর্কে মস্তিষ্ক অভিজ্ঞতা লাভ করবে।



চিত্রঃ এখানের সবকটি ফলের স্বাদের অনুভূতি কি আপনার আছে? ছবিঃ Visual Encyclopedia of Fruits

তবে আবার এমনও হতে পারে, আমরা যে অনুভূতি অনুভব করতে পারি না অন্যরা সেই অনুভূতি ঠিকই অনুভব করতে পারে। এমনও অনুভূতি থাকতে পারে যার সম্পর্কে এখন পর্যন্ত আমাদের কেউই কোনো অভিজ্ঞতা লাভ করেনি। এমনও হতে পারে দূরের কোনো গ্রহে এমন কোনো এলিয়েন আছে যাদের মস্তিষ্কে আমাদের চেয়ে ভিন্ন কোনো অনুভূতি কাজ করছে। কে জানে কী অদ্ভুত আর আশ্চর্যজনক অনুভূতি খেলা করছে তাদের মস্তিষ্কে।

তথ্যসূত্র

লেখাটি The Magic of Reality: How we know whats really true, 
D. Richard, Free Press, New York, 2011 এর প্রথম অধ্যায় what is reality?
What is magic? এর প্রথম অংশের ভাবানুবাদ।
আরও  জিরো টূ ইনফিনিটি।
 
 
 
লেখক 
 
জ্ঞান অন্বেষী  

চতুর্থ মাত্রায় ভ্রমণ - পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং

জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং আজ বুধবার মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর ও আপেক্ষিকতা নিয়ে গবেষণার জন...