Sunday, 6 August 2017

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমাবর্ষণ



পৃথিবীর ইতিহাসে এক জঘন্যতম দিন হিসাবে দিবস দুটি সকলের নিকট পরিচিত।৬ আগষ্ট হিরোশিমা দিবস।৯ আগষ্ট নাগাসাকি দিবস। আজ হিরোশিমা আর নাগাসাকি সম্পর্কে কিছু লেখার চেষ্টা করছি। 

৬ আগষ্ট,১৯৪৫, হিরোশিমা 
হিরোশিমা শহরটি জাপানের রাজধানী টোকিও শহর থেকে ৫০০ মাইল দূরে। ৬ আগষ্ট সকাল বেলা তখনো হিরোশিমা জনপথ কর্মচঞ্চল হয়ে উঠেনি, জীবিকার সন্ধ্যানে কিছু মানুষ ছুটে চলছিল। সকাল ৮.১৫ । হঠাৎ হিরোশিমা শহরের আকাশে দেখা দিলো দৈত্য বিমান বি-২৯ ইনোলো গে । হিরোশিমা নগরীর উপরে ছুড়ে মারলো আনবিক বোমা "লিটল বয়"। মূহুর্তের মাঝে সব কিছু লন্ড ভন্ড হয়ে গেল। ধ্বংস লীলায় পরিনত হলো গোটা শহর। 



পরিনতি কি হয়েছিল 
হিরোশিমায় বোমা বিস্ফোরনের স্থানটি ছিল বানিজ্যিক ও অফিস আদালতের স্থান। বিষ্ফোরনের সাথে সাথে ৫০০ মিটার বৃত্তের মাঝে আলীশান দালান চোখের পলকে নেতিয়ে পড়ে। ৫ বর্গমাইল এলাকা ছাই ও ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়। বিস্ফোরনের সময় নগরীতে লোকসংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ ৫০ হাজার। যার মাঝে সেই সময় থেকে ১০ আগষ্ট পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ১ লক্ষ ১৮ হাজার ৬৬১ জন। যার মাঝে সামরিক লোক মৃত্যুবরন করে প্রায় ২০,০০০ জন। 
হিরোশিমা prefectural স্বাস্থ্য বিভাগের অনুমান, বিস্ফোরণ দিনে যারা মারা গেছে তাদের মাঝে 60% ফ্ল্যাশ বা অগ্নিশিখা পোড়া, পতনশীল ধ্বংসাবশেষ থেকে 30% এবং অন্যান্য থেকে 10%। 
একটি মার্কিন গবেষনায় 15-20% বিকিরণ অসুস্থতা, থেকে 20-30% ফ্ল্যাশ পোড়া ও অন্যান্য আঘাত থেকে এবং 50-60% অসুস্থতা দ্বারা মারা গেছে। উভয় শহরে মৃতের অধিকাংশই ছিল বেসামরিক নাগরিক। 



ধ্বংসপ্রাপ্ত হিরোশিমা নগরী

লিটল বয় 
হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত বোমটির নাম "লিটল বয়"। নিজেদের প্রয়োজনে এটি নিক্ষেপের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। তিনি ছিলেন আকারে ছোট তাই তার নাম দেয়া হয় "লিটল বয়"। কিন্তু বোমা হামলা নির্দেশ দেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হেনরি ট্রুম্যান। বোমা বহনকারী বিমানটি ছিল বোয়িং বি-29 Superfortress Enola গে , আর সেই বিমানের পাইলট ছিলেন কর্নেল পল ​​। আর হামলা পরিচালনা করেন Tibbets এর 393rd বমবার্ডমেন্ট স্কোয়াড্রন, ভারি অফ, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী বিমান বাহিনী । এটি ছিল প্রথম আণবিক বোমা যা অস্ত্র হিসাবে হিসাবে ব্যবহৃত হয়। 


                         
এটিই প্রথম পারমানবিক বোমা যা মানুষ মারার জন্য ব্যবহার করা হয়ে ছিল

"Little Boy" model. 
প্রকারঃ পারমানবিক অস্ত্র 
উৎপত্তি স্থানঃ যুক্তরাষ্ট্র 
ওজনঃ 9.700 পাউন্ড (4,400 কেজি) 
লম্বাঃ 120 ইঞ্চি (3.0 মিটার) 
ব্যাসরেখাঃ 28 ইঞ্চি (710 মিমি) [1] 
চার্লসের ফলনঃ 13-18 kt (54-75 TJ 



ইনোলো গে বিমানের পাইলট কর্নেল পলসহ অন্যান্য ক্ররা 

হিরোশিমার বর্তমান অবস্থা 
১৯৪৯ সালে হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি পার্ক নির্মান করা হয়, হিরোশিমা Prefectural শিল্প উন্নয়ন হল, closest বোমা বিস্ফোরণ এর স্থানে জীবিত ভবন, Genbaku অট্টালিকা বা পরমাণু অট্টালিকা , হিরোশিমা শান্তি স্মৃতি জাদুঘর ১৯৫৫ সালে নির্মান হয়। 
হিরোশিমা ১৯৪৯ সালে জাপানি পার্লামেন্ট দ্বারা শান্তি শহরের ঘোষিত হয়। হিরোশিমা উপসাগরকে ঝিনুকের আঁধার বলা হয়। সরকার আর জনগনের চেষ্টায় এই শহর এখন হয়ে শান্তি আর উন্নয়নের নগরী।

Genbaku অট্টালিকা বা পরমাণু অট্টালিকা 
৯ আগষ্ট, ১৯৪৫, নাগাসাকি 
জাপানের আরেকটি ব্যস্ত শহর নাগাসাকি। স্থানীয় সময় রাত ৩টা ৪৭মিনিট। নগরীর সবাই তখন গভীর ঘুমে বিভোর। সেই ঘুম থেকে অনেকেই চিরনিদ্রায় চলে গিয়েছে। হিরোশিমার পুনরাবৃত্তি হলো নাগাসাকিতে। নিক্ষিপ্ত হলো আনবিক বোমা" ফ্যাটম্যান"। নিমিশেই ঘুমন্ত নগরীকে পরিনত করলো মৃত্যু নগরীতে। 



নাগাসাকির পরিনতি 
আগস্ট 9, 1945 তারিখে, নাগাসাকিতে ছিল পারমাণবিক বোমা হামলা দ্বিতীয় লক্ষ্য । আনুমানিক ৪০,০০০ মানুষ বোমা হামলায় নিহত হয়েছে । পাশাপাশি ৭৪,৯০৯ আহত এবং অন্য কয়েক শো হাজার বিপর্যয় এবং অন্যান্য অসুস্থতা বিকিরণ দ্বারা ফলে অসুস্থ এবং মারা যায়। এই বোমা ছিল "লিটল বয়"থেকেও বেশি ধ্বংসাত্মক । কিন্তু হিরোশিমার মতো বানিজ্যিক এলাকায় না ফেলে ফেলা হয় একটি উপত্যকায়। তবুও ক্ষতি ছিল একই পরিমাণ । 
ফ্যাটম্যান 


মূল অস্ত্র এর Mockup 
প্রকারঃ পারমানবিক অস্ত্র 
উৎপত্তি স্থানঃ যুক্তরাষ্ট্র 
ওজনঃ 10.213 পাউন্ড (4,633 কেজি) 
লম্বাঃ 10.7 ফুট (3.3 মিটার) 
ব্যাসরেখাঃ 5 ফুট (1.5 মিটার) 
চার্লসের ফলনঃ 21 kt (88 TJ) ~ ডিনামাইট 75 মিলিয়ন লাঠি। 
বহনকারী বিমানের নামঃ বি-২৯ সুপারকোর্টস; অন্য নাম বক্সকার। 
বিমানের পাইলটঃ মেজর চার্লস ডব্লু সুইনি।

হিরোশিমা-নাগানাকিতে পারমানবিক হামলা প্রভাব 
প্রতিবছর ৬ ও ৯ আগষ্ট ঘুরে ঘুরে আসে। আমেরিকার নির্মমতার কথা জাপানিরা কখনো ভুলতে পারবে না। লিটল বয় এর ধ্বংসজজ্ঞ এতটাই ছিল যে, ২ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে কাঠের যত স্থাপনা ছিল সবই মাটির সাথে মিশে গিয়েছে। চোখের নিমিশে পুরে ছাই হয়ে গিয়েছে শহরের অধিকাংশ স্থান। ৬৬ বছর পরেও হিরোশিমা নাগাসাকি শহরের মানুষেরা তেজস্ক্রিয়তার ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। এখনো দেখা যায় তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে পঙ্গুত্ব, বিকলাঙ্গসহ নানা প্রকার রোগব্যাধী। হিরোশিমায় ঐ বছর শেষ পর্যন্ত মারা যায় প্রায় ১ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষ আর নাগাসকিতে মারা যায় প্রায় ৮০ হাজার মানুষ। 


বোমার প্রভাবে আক্রান্ত শিশু 
পরিশেষে 


হিরোশিমা নাগাসকি দিবস উপলক্ষে আমরা আনবিক ধ্বংস তান্ডব চিরতরে বন্ধ করার জন্য বিশ্ব নেতৃবৃন্দের নিকট আবেদন জানাই। বিশ্ববাসী যুদ্ধ নয়, শান্তি কামনা করে। কারণ, যুদ্ধ ধ্বংসজজ্ঞের পাহাড় সমৃদ্ধ করে, হানাহানির তীব্রতার ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটে , মানুষ হারিয়ে ফেলে মানবতা। বিশ্বের শান্তিকামী মানুষ চায় নিরাপদে জীবন যাবন করে পরিবার-পরিজন নিয়ে সমাজ তথা দেশের উন্নতি ঘটাতে। পরিশেষে আবারো জানাই আনবিক বোমায় নিহত হিরোশিমা ও নাগাসাকিবাসী ও তাদের আত্মীয় স্বজন এবং স্থায়ী পঙ্গুত্ববরনকারীদের প্রতি সমবেদনা । 

সূত্রঃ 
১. নয়াদিগন্ত, শতদল বড়য়া 
২.উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে 
৩. অ্যাফেয়ার্স ,আগষ্ট,১১ 
৪.নতুন বিশ্বকারেন্ট 
৫.আর.হক

লেখক  

জ্ঞান অন্বেষী  

No comments:

Post a Comment

চতুর্থ মাত্রায় ভ্রমণ - পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং

জগদ্বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং আজ বুধবার মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণগহ্বর ও আপেক্ষিকতা নিয়ে গবেষণার জন...